শুধু নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ নয়, সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির দাম বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি ধরা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ না করেই সরকারের শত শত কোটি টাকা লুটপাট স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এ অভিযোগ পুরনো। আর এ অনিয়ম দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যের বিতর্কিত ঠিকাদার মিঠুর প্রতিষ্ঠান, এই তথ্যও পুরনো। কিন্তু এবার নতুন করে সামনে এসেছে বরিশালের সত্য কৃষ্ণ পিপলাই পরিবারের অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা। তিনি নিজের ও স্ত্রী-সন্তানের নামে একাধিক লাইসেন্স করে বরিশাল বিভাগের কয়েকটি হাসপাতালে বছরের পর বছর মালামাল সরবরাহে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্র্নীতি করেছেন। কৃষ্ণ পরিবার স্বাস্থ্যের দক্ষিণাঞ্চলের মাফিয়া হয়ে উঠছেন বলে অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেছে। মামলার তদন্তকালে আরও অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যও উঠে আসছে। সেগুলোর বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান সংস্থাটির একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।
গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে সত্য কৃষ্ণ পিপলাই ও তার ছেলে সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন সিন্ডিকেট করে হাসপাতালে মালামাল সররাহের দরপত্রে এককভাবে অংশগ্রহণ, নিম্নমানের মালামাল সরবরাহ, অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে কম দামে মালামাল নিয়ে বেশি দামে সরবরাহ করে নানা কৌশলে বিল উত্তোলনের নামে সরকারি কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এর মধ্যে কৃষ্ণ পরিবারের কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতি সরকারি অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে।
দুদকের তথ্য বলছে, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে দরপত্রে অনিয়ম ও প্রতারণার প্রতিযোগিতামূলক দর দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগে গত বছর ২৬ নভেম্বর একটি মামলা করা হয়েছে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক পার্থ চন্দ্র পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আহমেদ (বর্তমানে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক), ঠিকাদার শিপ্রা রানী পিপলাই, তার ছেলে সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই এবং স্বামী সত্য কৃষ্ণ পিপলাইকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ৫ কোটি টাকার এপিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, ওষুধ, কেমিক্যাল, আসবাবপত্র ও কিচেন সামগ্রী ক্রয়ের জন্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ছয়টি গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করে। প্রতিটি গ্রুপে পাঁচটি করে দরপত্র বিক্রি দেখানো হলেও জমা পড়েছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানের দর। দরপত্র জমা দেয় মেসার্স আহসান ব্রাদার্স, পিপলাই এন্টারপ্রাইজ, বাপ্পী ইন্টারন্যাশনাল এবং শহিদুল ইসলাম নামে একজন দরদাতা। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ছিলেন ডা. শামীম আহমেদ। তিনি তিনটি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আহসান ব্রাদার্স, পিপলাই এন্টারপ্রাইজ এবং বাপ্পী ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ দেন। নির্বাচিত তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। তার বাবা সত্য কৃষ্ণ পিপলাই আহসান ব্রাদার্সের মালিক, মা শিপ্রা রানী পিপলাই বাপ্পী ইন্টারন্যাশনালের মালিক এবং সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই নিজেই পিপলাই এন্টারপ্রাইজের মালিক। তিন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাও একই, বরিশাল সদরের উত্তর কাটপট্টি। তিনটি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র সাজানো হয়েছে কাছাকাছি দর দিয়ে। এটি পিপিআর বিধিমালা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়ায় দুদক মামলাটি করে।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ৪ কোটির দরপত্রে অনিয়ম : বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ৪ কোটি ৩ লাখ টাকার মালামাল ক্রয়ের দরপত্র আহ্বানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট এক ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে ‘অযৌক্তিক ও কঠিন’ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ঠিকাদাররা। দরপত্রে ২৪টি ফরম বিক্রি হলেও জমা হয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র। যার মালিকানা আবার একই পরিবারের বাবা ও ছেলে। অর্থাৎ সত্য কৃষ্ণ পিপলাই ও সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই।
জানা গেছে, চলতি বছর ২৯ জানুয়ারি ওষুধ, যন্ত্রপাতি, গজ ব্যান্ডেজ, লিলেন সামগ্রী, রি-এজেন্ট এবং আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য ছয়টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। পত্রিকার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দরপত্র খোলার তারিখ ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ পত্রিকা বিজ্ঞপ্তির নির্ধারিত তারিখে দরপত্র না খুলে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ছয়টি প্যাকেজে ২৪টি ফরম বিক্রি হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্যাকেজে মেসার্স আহসান ব্রাদার্স এবং মেসার্স পিপলাই এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের ১২টি ফরম জমা হয়েছে। যার মালিক সত্য কৃষ্ণ পিপলাই এবং তার ছেলে সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই। অপ্রয়োজনীয় এবং কিছু কঠিন শর্ত দেওয়ার কারণে বাবা-ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া আরও কারও ফরম জমা হয়নি বলে অভিযোগ অন্য ঠিকাদারদের। এ ঘটনায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুজন ঠিকাদার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) এবং বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগে করেন।
বরিশাল হাসপাতালে ১১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহে অনিয়ম : বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আলোচিত কৃষ্ণ পরিবারের বিরুদ্ধে। সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে হাসপাতালটিতে এমএসআর সামগ্রী ও ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ২০২০ সালের ২ মার্চ টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ওই টেন্ডারে অংশ নিতে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ক্রয় করে এবং চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। এর মধ্যে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের সঙ্গে কোনো কাগজপত্র না দিয়ে শুধু শিডিউল দাখিল করেন। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি মালিকানাধীন মেসার্স আহসান ব্রাদার্স এবং মেসাস পিপলাই এন্টারপ্রাইজকে কৃতকার্য দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক সত্য কৃষ্ণ পিপলাই এবং তার ছেলে সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পিপলাই পরিবার একাই চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র দাখিল করে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিষয়টি জেনেও না দেখার ভান করে এবং মেসার্স আহসান ব্রাদার্স ও পিপলাই এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেয়। কার্যাদেশ পাওয়া পিপলাইয়ের প্রতিষ্ঠান দরপত্রে নন-রেসপনসিভ হওয়া আর্নিফকো হেলথ কেয়ার এবং মেডিসেফ করপোরেশন থেকে যন্ত্রপাতি এনে হাসপাতালে সরবরাহ করে। তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে বেশি মূল্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স পিপলাই এন্টারপ্রাইজ ও আহসান ব্রাদার্স অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে এ ক্ষেত্রে ৪ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার টাকার বিল তুলে নিয়ে যায়। এ ছাড়া এমএসআর সামগ্রী সরবরাহের নামে আরও ৬ কোটি ৪০ লাখ ৫৮ হাজার এবং ৯৬ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৪ টাকার বিল তুলে নেয়। সবমিলিয়ে পিপলাই এন্টারপ্রাইজ ও আহসান ব্রাদার্স অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ১১ কোটি ৫৩ লাখ ১৬ হাজার টাকার বেশি বিল তুলে নেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রয় প্রক্রিয়ায় যোগসাজশ না করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ক্রয় করলে সরকারি বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতো।