গতকাল শুক্রবার ছিল অমর একুশে বইমেলা-২০২৬-এর ১৬তম দিন। মেলার শেষ শুক্রবার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থী ও পাঠকের উপস্থিতি অন্য দিনের তুলনায় বেশি ছিল। যদিও আগের বছরের মতো লোকে লোকারণ্য অবস্থা দেখা যায়নি, তবুও এবারের মেলায় এদিনই ছিল সর্বোচ্চ উপস্থিতি। বিকেল গড়াতেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জুড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে মেলায় এসেছেন। পাঠকরা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে নতুন বই খুঁজে দেখেছেন এবং পছন্দের বই কিনেছেন। প্রিয় লেখকের নতুন বই সংগ্রহের পাশাপাশি অনেকেই নতুন লেখকদের বইয়ের প্রতিও আগ্রহ দেখিয়েছেন। সন্ধ্যার পর মেলার পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে স্টলগুলোতে বই ঘেঁটে দেখা, লেখক-পাঠকের আলাপ আর বই কেনাবেচার মধ্য দিয়ে জমে ওঠে বইমেলা।
বইমেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী ১৬তম দিনে নতুন বই এসেছে ২৭৭টি। এ নিয়ে সর্বমোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৬১৪। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেলায় প্রকাশিত সব বই তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়ে না। নানা কারণে অনেক প্রকাশক তাদের সব নতুন বই জমা দেন না। ফলে প্রকৃতপক্ষে নতুন বইয়ের সংখ্যা হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবারের মেলায় কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা, অনুবাদ ও শিশুতোষ সাহিত্যসহ নানা ধারার নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বই। এবারের মেলায় বিশেষ করে তরুণ লেখকদের নতুন গ্রন্থ এবং সমকালীন নানা বিষয়কে ঘিরে লেখা বইয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন কণ্ঠের লেখক এবং নতুন ভাবনার বই খুঁজে নিতে পাঠকরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক স্টল থেকে আরেক স্টলে।
বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশিত হলেও মান নিয়ে কিছুটা হতাশার কথাও উঠে এসেছে। গবেষণা সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক ও প্রাবন্ধিক ইসরাইল খান বলেন, অনেক লেখকের মধ্যেই সৃজনশীল সাধনার ধারাবাহিকতা কমে যাচ্ছে। রাতারাতি পরিচিতি পাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সাহিত্যের মানও অনেক ক্ষেত্রে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। তিনি জানান, তার গবেষণাগ্রন্থ সাময়িকপত্রে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক প্রকাশ করেছে ইউপিএল।
অন্যদিকে অমর একুশে বইমেলার তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়া নতুন বইয়ের তালিকায় বিভিন্ন ধারার বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ স্থান পেয়েছে। গবেষণাধর্মী বইয়ের মধ্যে রয়েছে রাফাত আলমের বাংলাদেশের উপন্যাস সাতচল্লিশের রাজনীতি (বাংলা একাডেমি, ভাষা-সাহিত্য প্রকল্প) এবং খ ম আ শুকুরের লালন সাঁই ও তার সামাজিক প্রভাব (নব সাহিত্য প্রকাশনী)। ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সনৎকুমার সাহার নিম্নবর্গের খতিয়ান : আত্মোপলব্ধি ও আত্মপ্রতারণা (কথাপ্রকাশ)।
উপন্যাসের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। এসবের মধ্যে রয়েছে জসিম গাজীর রুদ্রের অনুস্তর ও রক্তজবা (রয়েল পাবলিকেশন), সাজ্জাদ হোসেনের প্রিয়ার চোখে জল (নব সাহিত্য প্রকাশনী), শতাব্দী ঘোষের মহুয়াকথন (বাংলার প্রকাশন) এবং ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাস সংগ্রহ-১ (কথাপ্রকাশ)। দাঁড়িকমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফজলে রাব্বির কাঁচপোকার টিপ, ফাহিম মাহমুদের দ্বিতীয় আলয়, তাশরীফ বিন হেদায়েতের ইশ প্রিয়তমা! এবং ফারজান মাহমুদ আলবির আধো আলো ছায়াতে। এ ছাড়া কধুহধঃ অংয-এর ইংরেজি উপন্যাস ঞযব ঋরভঃয ঈড়ষঁসহ ও প্রকাশিত হয়েছে এবারের মেলায়।
মেলায় আরও এসেছে কথাপ্রকাশ থেকে সালেক খোকনের ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’, উৎস থেকে ডা. শাহলা খাতুনের ‘কীর্তিমতী’, অনন্যা থেকে মতিন রায়হানের ‘কাটে দিন বসন্ততালাশে’সহ বেশকিছু বই।
মোটের ওপর মেলার একেবারে শেষ দিকে নতুন বইয়ের প্রাচুর্য, পাঠকের আগ্রহে জমে ওঠা ভিড়ে বইমেলার আবহে আবারও ফিরে এসেছে বইপ্রেমীদের সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস।
গতকাল শুক্রবার বইমেলা বেলা ১১টায় শুরু হয়ে চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা : ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে মো. আফ্ফান আল হাসনাইন, দ্বিতীয় আনহিতা রেদোয়ান আভা, তৃতীয় মো. রিসালাত শাহ। ‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছে চারুলতা রহমান জারা, দ্বিতীয় বায়ান রাশদান, তৃতীয় দ্যুলোক দ্যুতিমান। ‘গ’ শাখায় প্রথম হয়েছে শ্রেয়া রায়, দ্বিতীয় স্বস্তি চৌধুরী, তৃতীয় হয়েছে আদিত্য সাহা।
শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে পূর্ণতা আদিত্য, দ্বিতীয় সাহানা ইসলাম সাইফা এবং তৃতীয় আরওয়া রহমান তাজরি। ‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, দ্বিতীয় বেহজারিন হাসান তারফি এবং তৃতীয় কারিমা হোসাইন দিয়া এবং ‘গ’ শাখায় প্রথম হয়েছে সিমরিন শাহীন রূপকথা, দ্বিতীয় রাজ্যশ্রী সাহা এবং তৃতীয় হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ।
শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : ‘ক’ শাখায় প্রথম হয়েছে শ্রীজা ম-ল, দ্বিতীয় মাগফিরাহ্ মাবরুরা তৈষী এবং তৃতীয় হিয়াঞ্জলি তরফদার। ‘খ’ শাখায় প্রথম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, দ্বিতীয় সার্থক সাহা এবং তৃতীয় বিদ্যাস্তুতি সিংহ। ‘গ’ শাখায় প্রথম হয়েছে রোদসী নূর সিদ্দিকী, দ্বিতীয় তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং তৃতীয় হয়েছে নাবিলা আক্তার রায়না।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) পরিবেশনা।
আজকের সময়সূচি : আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।