উত্তরের ৪ স্থানে জটের ভয়

ঈদযাত্রায় যমুনা সেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে প্রধানত ছয়টি কারণে চারটি স্পটে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশে ছয় লেনের গাড়ির চাপ পড়বে দুই লেনে। লক্কড়ঝক্কড় মার্কা লোকাল বাস মহাসড়কে বিকল হয়ে ভোগান্তি বাড়াবে। ফ্লাইওভার ও মহাসড়কে নির্মাণকাজ চলমান থাকায় যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে। টোল আদায়ের ধীরগতি বা সাময়িক বন্ধ রাখা যানজটে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সেতুতে মোটরসাইকেল বা বাইকের অতিরিক্ত চলাচল মহাসড়কে যানজট সৃষ্টির সহায়ক হবে। এবারও উত্তরের পথে ঈদযাত্রায় এই ছয় কারণে এলেঙ্গা, গোলচত্বর, টোলপ্লাজা ও সেতুর ওপর এই চারটি প্রধান স্পটে যানজটের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, উত্তরের পথে ঈদযাত্রায় যমুনা সেতু-টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে সাধারণত প্রতিদিন ২৪ জেলার ২০-২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশ কয়েক বছর ধরে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের সময় যমুনা সেতু পারাপার হওয়া যানবাহনের সংখ্যা ৬৬ হাজারের বেশি হয়। ঢাকার দিক থেকে ছয় লেনে (সার্ভিস লেনসহ) আসা এসব যানবাহন এলেঙ্গা থেকে দুই লেনে প্রবেশ করতেই গতি কমে যায়। ফলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ঢাকা থেকে আসা লক্কড়ঝক্কড় মার্কা ফিটনেসবিহীন লোকাল বাস মহাসড়কে বিকল হয়ে ভোগান্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এবারও প্রশাসন ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে চাইলেও গাড়ি বিকল হওয়া, বাইকের অতিরিক্ত চলাচল, দুর্ঘটনা, টোল আদায়ে সমস্যা এবং দুই লেন-ছয় লেনের জটিলতায় ভোগান্তি থেকে যাবে বলে জেলা প্রশাসনের তিন দফা নিরাপদ ঈদযাত্রার সভায় চিহ্নিত করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয়ের সমাধানে দিনরাত কাজ করছেন।

সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশের গোড়াই থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেন চালু রয়েছে। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার চার লেনের কাজ চলমান। এই মহাসড়কের টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার টাঙ্গাইলের মধ্যে পড়েছে। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ২০-২২ হাজার যানবাহন সেতু পারাপার হয়। ঈদের ছুটি শুরু হলে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত স্বল্প আয়ের মানুষ কম খরচে ঢাকার লোকাল বাস বা বিকল্প পরিবহনে ঘরমুখী যাত্রা শুরু করে। কিছু বাস পথে বিকল হয়ে পড়ে। বিকল হওয়া এসব গাড়ি সরাতে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগে। আর এতেই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়, যা ছাড়াতে অনেক সময় লেগে যায়।

সেতুর টোলপ্লাজা সূত্র জানায়, গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ২৫ মার্চ ৪৮ হাজার ৩৬৮টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়। ঈদুল আজহার ছুটি শুরুর পর গত বছরের ১৫ জুন ৬৬ হাজার ৪৮৯টি যানবাহন পারাপার হয়। টোল আদায়ের বুথ বাড়িয়ে সড়কের শৃঙ্খলা রেখে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার সব আয়োজন ঠিক ছিল। এরপরও লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি বিকল হয়ে ভোগান্তির সৃষ্টি করেছিল।

টাঙ্গাইল শহর বাইপাস থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার সড়ক সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের অবস্থা অনেকটাই ভালো। এলেঙ্গার পর থেকে চার লেনের কাজ চলছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের পর ফ্লাইওভারের কাজও চলমান। তবে সম্পূর্ণ সড়কেই চার লেন চালু আছে।

সরেজমিনে গিয়ে মহাসড়কে চলাচলকারী নির্জন এন্টারপ্রাইজ বাসের হেলপার আব্দুল বাসেত, শ্রাবণ এন্টারপ্রাইজের বাসচালক সালাউদ্দিন, বাসচালক সাহেব আলীসহ অনেকে জানান, ঈদ এলেই ফিটনেসবিহীন যানবাহন যত্রতত্র চলাচল করে। সেসব যানবাহন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বিকল হলেই ঈদের যানজট শুরু হয়। কারণ সেই যানবাহন উদ্ধারে সর্বনিম্ন ৩০ মিনিট সময় লাগে। ঈদের সময় মহাসড়কে ৩০ মিনিট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ মহাসড়কের যমুনা সেতুর ওপর মোটরসাইকেল বা বাইকচালকদের আরেক যন্ত্রণা শুরু হয়। তারা একটু ফাঁক পেলেই বাইকের মাথা ঢুকিয়ে দেন। যদিও বাইকের জন্য সেতু কর্র্তৃপক্ষ (বাসেক) আলাদা টোল বুথের ব্যবস্থা করে তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু সেতুর ওপর ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঈদের সময় সেতুতে যানবাহন ধীরগতিতে এবং একটার সঙ্গে আরেকটা লাগালাগি করে চলাচল করে। সেই মুহূর্তে একটু জায়গা পেলেই বাইকচালকরা মাথা ঢুকিয়ে দেয়। এতে অন্য যানবাহনের চালকরা বিড়ম্বনার শিকার হন।

তারা জানান, কয়েক বছর ধরে এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটারে ফোর লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলছে। কাজের ধীরগতির কারণে চালক ও যাত্রী সাধারণ যন্ত্রণাদায়ক ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। মহাসড়কে অনেক বড় কাজ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এই সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের কাজ অদৃশ্য কারণে শেষ হচ্ছে না। ঈদ এলে তারা বড় বড় বুলি ছাড়েন, সাময়িকভাবে কাজের গতি বাড়ালেও সারা বছর কাজ গতিহীন থাকে।

মহাসড়কের উন্নয়নকাজে নিয়োজিত আব্দুল মোনেম লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আউয়াল জানান, এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের কাজ প্রায় শেষ। মহাসড়কের দুই পাশের সদ্য সম্পন্ন চার লেন যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এতে ঈদযাত্রায় কোনো সমস্যা হবে না।

হাইওয়ে পুলিশের এলেঙ্গা ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. শরীফ জানান, গত বছরও ঈদে সেতুর ওপর এবং মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানবাহন বিকল হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। ছয় লেনের সড়ক হলেও ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামলে যানজটের শঙ্কা থেকেই যায়। তিনি জানান, একটি যানবাহন বিকল হলে তা মহাসড়ক থেকে সরাতে ন্যূনতম ১০ মিনিট সময় লাগলেও দীর্ঘ জটের সৃষ্টি হয়।

যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে সাতটি করে বুথে টোল আদায় করা হয়। ঈদের ছুটি শুরু হলে টোলপ্লাজায় বুথের সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রতি প্রান্তে ৯টি করে ১৮টি বুথে টোল আদায় করা হবে। এ ছাড়া মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক বুথ থাকবে। সেতুতে যানবাহন বিকল হলে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে তা সরিয়ে নেওয়ার জন্য র‌্যাকার প্রস্তুত রাখা হবে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, টাঙ্গাইলের রাবনা বাইপাস থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ১৪টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। মহাসড়কে ৩টি শিফটে ২৪ ঘণ্টাই পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশকে চার ভাগ করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকে ঈদের পর সাত দিন মহাসড়কে যানজট নিরসনে এক হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।