নড়াইলের মাঠ জুড়ে সূর্যমূখী ফুলের হাসি, নতুন স্বপ্নে বিভোর চাষীরা

নড়াইলের মাঠ জুড়ে এখন সূর্যমূখী ফুলের হাসি। সবুজের মাঝে সূর্যমূখী ফুলের হলুদ হাসি যেমন মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছে, তেমনি ভোজ্য তেলের অভাব পূরণে নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে জেলায় ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে সূর্যমূখীর আবাদ শুরু হয়েছে। সয়াবিন তেলের তুলনায় কম কোলেস্টেরল এবং সহজে চাষ উপযোগী হওয়ায় সূর্যমূখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে চাষীরা। 

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলার বিভিন্ন মাঠে এ বছর সূর্যমূখীর চাষ বেড়েছে। গত তিন বছরের তুলনায় এ বছর সূর্যমূখীর আবাদ প্রায় তিন গুন বেড়েছে। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে জেলায় সূর্যমূখীর আবাদ জমি ছিল ৯৮ হেক্টর জমিতে। যা থেকে উৎপাদন হয় ২২৮ মে.টন সূর্যমূখী বীজ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১০৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমূখীর আবাদ করা হয়। যা থেকে উৎপাদন হয় ২৪২ মে.টন সূর্যমূখী বীজ। এরপর ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে ১১০ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়, যা থেকে উৎপাদন করা হয় ২৫৪ মে.টন। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ১১৭ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ১৯১ হেক্টর জমিতে। যা থেকে জেলায় ৪৪৩ মে.টন সূর্যমূখী বীজ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। চাষীরা প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকার সূর্যমূখী বীজবিক্রি করতে পারবেন বলে আশা কৃষি বিভাগের।

নড়াইল শহর সংলগ্ন সীমাখালী গ্রামের সূর্যমূখী মো. হোসেন আলী জানান, তিনি ৫০ শতক জমিতে হাইসান-৩৬ জাতের সুর্যমুখীর চাষ করেছেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় তিনি বীজ ও সার পেয়েছেন। বর্তমানে গাছগুলি ফুলে ফুলে ভরে গেছে। ভালো ফলন ও লাভের আশা করছেন তিনি।

একই গ্রামের চাষী মো. সেলিম হোসেন জানান, তিনি নিজ উদ্যোগে জমিতে সূর্যমূখীর চাষ করেছেন। সয়াবিন তেলের পরিবর্তে সূর্যমূখী তেল ব্যবহার করবেন বলে তিনি জানান।

সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের চাঁচড়া গ্রামের মো. ইকবাল হোসেন বলেন, গত বছর তিনি ১৪ শতক জমিতে সাড়ে ৪ মন ফল পেয়েছি। সেই তেল এখনো খাচ্ছি। সূর্যমূখী চাষ লাভজনক। খরচ তেমনি বেশি না। সরিষা থেকে লাভজনক হওয়ায় আমরা সূর্যমূখী চাষ শুরু করেছি।

চাঁচড়া গ্রামের আরেকজন চাষী আব্দুল্লাহ মোল্যা বলেন, গত বছর বেশ কিছু মানুষ সূর্যমূখী চাষ করেছিল। তাদের দেখাদেখি আমি এ বছর সূর্যমূখীর চাষ করেছি। সূর্যমূখীর তেল হার্টের জন্য বিশাল উপকারী। সে জন্য লাগাইছি। তেল নিজে খাবো এবং বাজারেও বিক্রি করবো।
এছাড়া একাধিক চাষী জানান, সরিষা আবাদে অনেক সময় ঝুঁকি থাকে। অধিক বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু বৃষ্টির পানিতে সূর্যমূখীর কোন সমস্যা হয় না। বরং ফলন ভাল হয়৷ গতবছর অনেক কৃষক সূর্যমূখী চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছে। তাই এবছর অনেকেই নতুন করে চাষ শুরু করেছে। আগামীতেও নতুন করে অনেকেই সূর্যমূখীর চাষ করবে। এছাড়া সূর্যমূখী চাষের কারনে জমিতে বেশি আগাছা হয় না। সবকিছু মিলিয়ে সূর্যমূখী চাষের মাধ্যমে নিজেদের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া হতে পারবেন বলে চাষীরা জানান।

নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রোকনুজ্জামান জানান, এবছর বারী সূর্যমূখী-৩, হাইসান-৩৩, হাইসান-৩৬ সহ বিভিন্ন জাতের সূর্যমূখীর চাষ হয়েছে। সূর্যমূখী সাধারণ জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি লবণাক্ততাও সহ্য করতে পারে। ৩৩ শতকের বিঘায় প্রায় ৮ থেকে ১০মন ফলন আসে। বীজ থেকে ৪৫/৫০% তেল পাওয়া যায়্। কৃষি বিভাগের সার্বিক সেগিতায় চাষীরা সূর্যমূখী চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপ-পরিচালক  মুহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, নড়াইল জেলায় এ বছর ১ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে প্রতি ১ বিঘা জমির জন্য সূর্যমূখী বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মোতাবেক জেলায় সয়াবিন তেলের আমদানী কমিয়ে ভোজ্য তেলে স্বয়ংসম্পুর্ণ হতে সূর্যমূখীর চাষাবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।