যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে কে?

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। প্রত্যক্ষ সমস্যা হিসেবে, তেল বাণিজ্য অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তেল স্বার্থ এখন মধ্যপ্রাচ্যকে ছাড়িয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দৈনন্দিন জীবনচর্চায়। হু হু করে বাড়ছে নিত্যব্যবহৃত পণ্যের দাম। ভোক্তাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় এই অবস্থা বাংলাদেশের হলেও দরিদ্র সব দেশের জন্য তা একই রকম। আবার উপসাগরীয় যুদ্ধের এই অগ্নিকু-ে রাশিয়া ও চীনের মদদ ইরানকে নতুন করে অতিরিক্ত শক্তি জোগাচ্ছে। প্রচলিত যুদ্ধের ধারণাও যে পাল্টে যাবে, সেটা বুঝতে পারলেও, তার রূপ কেমন হবে বা হতে পারে, তা বোঝা ছিল কঠিন। যুদ্ধের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে গেছে যুদ্ধে। এই যুদ্ধে পক্ষ-প্রতিপক্ষের সম্মুখ সমর নেই। স্থলবাহিনী, ট্যাংক বা কামানের দেখা নেই। ভূমি দখলের নিউজ নেই। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিউজ পেলেও, সেগুলোর লক্ষ্যবস্তু বা স্থান চিহ্নিত হচ্ছে, এনক্রিপ্ট করা স্থানাঙ্কের মাধ্যমে। এর সঙ্গে রাডার বিম, স্যাটেলাইট ফিড যুক্ত হয়েছে। সম্মুখ সমরের ধারণা পাল্টে যাওয়ায়, আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক শক্তি ইরানের মতো দেশকে পরাজিত করতে পারেনি। বরং পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের বক্তব্য হচ্ছে এই প্রক্সিযুদ্ধে ইরান ব্যবহার করছে রাশিয়ার রণকৌশল।

যুক্তরাজ্যের চিফ অব জয়েন্ট অপারেশনস লে.জে. নিক পেরি বলেছেন রাশিয়া এখন ইরান ও তাদের অনুগত গোষ্ঠীগুলোকে ড্রোন মোতায়েন ও ব্যবহারের বিষয়ে কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছে। ইরানিরা এখন খুব নিচে দিয়ে ড্রোন চালনা করছে। তাতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। ওগুলো ঠেকানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। পুতিনের অদৃশ্য হাত রয়েছে ইরানের রণকৌশলে। এটা নিশ্চিত করেই বলছে পশ্চিমারা। কারণ হিসেবে বলেছে, এতে রাশিয়া লাভবান হচ্ছে। তার সামরিক তহবিল শক্তিশালী হচ্ছে। গত জুনে ইরান-ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে মূলত যুদ্ধের কাঠামোগত স্ট্র্যাটেজিতে রূপান্তর এনেছে ইরান। রাশিয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য ইরানকে সরবরাহ করছে দাবি মার্কিনি তিন কর্মকর্তার। ওয়াশিংটন পোস্টে বলা যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এমন দাবি শুধু একটি কৌশলগত জোটের চিত্র তুলে ধরে না, বরং নতুন ধরনের যুদ্ধের কাঠামো উন্মোচন করে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে চলছে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেক্ট্রাম বা তড়িৎ চৌম্বকীয় বর্ণালিতে যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনি-ইসরায়েলি হামলার রূপ যে ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে, নতুন নতুন লেজার-অস্ত্র যা উভয়পক্ষকে প্রতিযোগিতায় নামিয়েছে। ইরানকে হারাতে চেয়েও ট্রাম্প আর তা পারছেন না। তিনি এই যুদ্ধের কারণে দেশের জনগণের কাছে অপছন্দনীয় হয়ে উঠেছেন।

অর্থনীতিতে টান না পড়লেও ভোটার জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সমস্যা হতে পারে। এজন্য তিনি যুদ্ধ থেকে বেরুতে চাইলেও, তার লেজুড় নেতানিয়াহু যুদ্ধে থাকতে চান। এতে করে পরিস্থিতি জটিল ও ঘোলা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন ইরানের পাশে প্রকাশ্যে নেমে যাওয়ায় এই যুদ্ধ সুপারন্যাচারাল প্রক্সিযুদ্ধ থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হারবে, অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। কারণ তার প্রতিপক্ষ এখন রাশিয়া, চীন ও ইরানের সম্মিলিত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক শক্তি বেশি। চীনের ক্ষমতা ও দক্ষতার প্রকাশ এখনো দেখা যায়নি। দেশটি নীরবে-নিভৃতে সামরিক ক্ষমতাকে নতুন ডিজাইনে সাজিয়ে তুলেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। মিঠাপানির জন্য যুদ্ধ হতে পারে। আর তার সূচনা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো থেকেই হবে। খাদ্যের জন্যও যুদ্ধ অনিবার্য। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ শস্যভা-ার থাকার পরও, আফ্রিকায় ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষ বাঁচানোর উদ্যোগ নেই আমেরিকার। ধ্বংস করাই যেন তার লোভী চেহারায় ফুটে আছে।