মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন চা–বাগানে প্রায় তিন মাস আগে শুরু হয় চা–গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ। সাধারণত শীত মৌসুমের শুরুতে এই ছাঁটাই কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর কিছুদিন বাগানগুলোতে রুক্ষ ও শুষ্ক পরিবেশ বিরাজ করে। কারণ ছাঁটাইয়ের পর নতুন কুঁড়ি ও পাতা গজাতে চা–গাছের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক বাগানে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে গাছের পানির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছিল।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই হঠাৎ আগাম বৃষ্টিপাত চা–বাগানগুলোতে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। বৃষ্টির স্পর্শে চা–গাছগুলোতে আবার দেখা দিতে শুরু করেছে নতুন কুঁড়ি ও কোমল পাতা। ধুলাবালি ধুয়ে গিয়ে বাগানগুলোও হয়ে উঠেছে সতেজ ও সবুজ। একই সঙ্গে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকেও গাছগুলো কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চা–বাগানসংশ্লিষ্টরা জানান, মৌসুমের শুরুতেই এই বৃষ্টি চা–উৎপাদনের জন্য ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে। কারণ বৃষ্টির পর চা–গাছে দ্রুত কুঁড়ি বের হতে শুরু করে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই চা–পাতা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে এবং উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, ১৩ মার্চ রাত থেকে ১৪ মার্চ ভোর পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলে মোট ৪৪ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহে এ অঞ্চলে আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চা–বাগানসহ কৃষি খাতের জন্য ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরেজমিনে উপজেলার জেরিন, ভাড়াউড়া খাইছড়া ও বিটিআরআইসহ বিভিন্ন চা–বাগান ঘুরে দেখা যায়, আগাম বৃষ্টির ছোঁয়ায় গাছগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। কয়েকদিন আগেও ছাঁটাই করা গাছের কারণে বাগানজুড়ে কিছুটা শুষ্কতা দেখা গেলেও এখন ধীরে ধীরে নতুন সবুজ পাতায় ভরে উঠছে পুরো এলাকা। অনেক গাছের গুঁড়া ও ছাঁটাই করা ডালপালার বিভিন্ন অংশে নতুন কুঁড়ি বের হতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ইতোমধ্যে ছোট ছোট সবুজ পাতা গজাতে শুরু করেছে। এদিকে কয়েকটি বাগানে শ্রমিকদের চা–পাতা সংগ্রহের প্রস্তুতিও নিতে দেখা গেছে। কেউ পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত, আবার কোথাও ঝুড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ইস্পাহানি জেরিন চা–বাগানের উপ-মহাব্যবস্থাপক সেলিম রেজা। তিনি বলেন, শীত শুরুর পর থেকে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় আমরা কৃত্রিমভাবে সেচের মাধ্যমে গাছগুলোতে পানি সরবরাহ করছিলাম। এতে গাছগুলো কিছুটা টিকে থাকলেও স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য বৃষ্টির বিকল্প নেই। হঠাৎ হওয়া এই আগাম বৃষ্টি চা–বাগানের জন্য অত্যন্ত উপকারী হয়েছে।
বাংলাদেশীয় চা সংসদের (বিসিএস) সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও ফিনলে চা ভাড়াউড়া ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ শিবলী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না থাকায় বাগানগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিক এই বৃষ্টিপাতের ফলে চা–গাছগুলো আবার সজীব হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নতুন চারা ও ছাঁটাই করা গাছগুলোর জন্য এই বৃষ্টি অত্যন্ত সহায়ক। ইতোমধ্যে অনেক গাছে নতুন কুঁড়ি দেখা যাচ্ছে। সামনে যদি আরও বৃষ্টি হয়, তবে দ্রুত চা–পাতা চয়ন শুরু করা সম্ভব হবে এবং চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমও গতি পাবে। এতে চলতি মৌসুমে চা–উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের চা–শিল্পের জন্যও ইতিবাচক হবে।