বর্তমান পর্যায়ে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক কৌশলের পরীক্ষা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই কৌশলই শেষ পর্যন্ত সংঘাত বেড়ে যাওয়ার ফাঁদে পরিণত হতে পারে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কৌশলগত লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয় এবং তা বারবার বদলাচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ও আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হত্যা করা হলেও ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। এ ছাড়া উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ এখনো সুরক্ষিত হয়নি। এর মধ্যেই ইরানের ওপর বিমান হামলা আরও বাড়ানো হচ্ছে এবং নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তেহরান যে পাল্টা কৌশল নিয়েছে, তাকে বিশ্লেষকরা ‘হরাইজন্টাল এস্কেলেশন’ বা ভৌগোলিকভাবে সংঘাত বিস্তারের কৌশল বলছেন। বহুদিন ধরে প্রস্তুত করা এ পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে যুদ্ধকে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে এ সংঘাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে একটি ভঙ্গুর ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে নানা জিনিস উঠে আসবে। বিশ্লেষকরা বিশেষ করে ‘এস্কেলেশন ট্র্যাপ’ নিয়ে সতর্ক করছেন। এর অর্থ হলো, আক্রমণকারী পক্ষ এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা প্রথমে কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল, দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। কারণ, সামরিক অভিযানের কৌশল ও কৌশলগত-পর্যায়ের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। সহজভাবে বললে, ট্যাকটিক্যাল স্তর হলো নির্দিষ্ট সামরিক কাজ। যেমন, বিমান হামলা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে। এ ক্ষেত্রে অভিযান বেশ সফল হয়েছে। কিন্তু কৌশলগত স্তর নির্ধারণ করে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে কি না এবং কী মূল্যে তা অর্জিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ রবার্ট পেপ বলেন, এস্কেলেশন ট্র্যাপ সাধারণত কয়েকটি ধাপে তৈরি হয়। তার ভাষায়, প্রথম হামলায় আমরা প্রায় শতভাগ ট্যাকটিক্যাল সাফল্য দেখেছি। কিন্তু যখন তা কৌশলগত সাফল্য এনে দেয় না, তখন দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো হয়। তিনি বলেন, তখন আক্রমণকারী মনে করে যে তার এখনো শক্তির আধিপত্য রয়েছে, ফলে সে হামলা আরও বাড়ায় এবং সংঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু তাতেও কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ না হলে তৃতীয় ধাপে পৌঁছায়। যেখানে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবা হয়। আমার মতে, এখন আমরা দ্বিতীয় ধাপে আছি এবং তৃতীয় ধাপের খুব কাছাকাছি।
পেপের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন প্রথম হামলার সাফল্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে, তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘নিয়ন্ত্রণের ভ্রম’ তৈরি হয়েছে, যা মূলত অস্ত্রের নিখুঁত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। এর ফলে তেহরানও নিজের কৌশল অনুযায়ী সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আকারে নিয়ে যেতে উৎসাহিত হচ্ছে। ইরান উপসাগরীয় দেশগুলো ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে দেখিয়েছে যে, তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারলেও যুদ্ধের খরচ অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।
পেপ বলেন, ইরানের হামলার উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর জনগণের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি করা, কেন তারা এমন একটি যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে, যা মূলত ইসরায়েলের বিস্তৃত নীতির কারণে শুরু হয়েছে।
এদিকে ইসরায়েল আরও সংঘাত বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, লেবাননে অভিযান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, হিজবুল্লাহ যদি রকেট হামলা বন্ধ না করে, তবে ইসরায়েল লেবাননের কিছু এলাকা দখলও করতে পারে। ইরানবিষয়ক সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের দূত ও পারমাণবিক আলোচনার প্রধান আলোচক রবার্ট ম্যালি বলেন, এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এগোবে, তা হয়তো স্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনার চেয়ে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব দ্বারা বেশি প্রভাবিত হতে পারে। তার মতে, কোনো একসময় হয়তো সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ পাওয়া যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা আমরা এক মাস আগেও কল্পনা করিনি, যেমন স্থলবাহিনী মোতায়েন, অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা, ইরানের কিছু অঞ্চল দখল বা কুর্দিদের মতো জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করা।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব পদক্ষেপ আবার ইরানের পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও ঘটতে পারে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেন, এ সংঘাতের গতিপথ মূলত কয়েকটি ভিন্ন বিতর্কের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের মতপার্থক্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য এবং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে মতবিরোধ।