নতুন গণতন্ত্রে পুরনো আমলাতন্ত্র 

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রশাসনিক, সামাজিক, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক নতুন অভিযাত্রায় আসতে অনেকগুলো পর্ব পার হতে হয়েছে বাংলাদেশকে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনায় ফুলস্টপ টানতে চেয়েছে ছাত্র-জনতা। বহু প্রাণ ও রক্ত হানিতে তারা দেশের মানচিত্র বদলাতে চায়নি। কেবল শাসনক্ষমতায় রদবদল চায়নি। আকাক্সক্ষা ছিল, ‘গণতন্ত্রের নতুন পথচলা’। সেই চলতি পথে গণতন্ত্রের যে দশাই হোক, দ্রুত অবস্থান গেড়ে বসেছে আমলাতন্ত্র। পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতেই চলছে নতুন গণতন্ত্র।  পুরনো ধ্যান-ধারণার আমলাতন্ত্রের সঙ্গে নতুন গণতান্ত্রিক সমন্বয় ব্যাপক। যার পরিণতিতে রাজনৈতিক সমন্বয় মার খেতে বসেছে। রাজনীতি, অর্থনীতির যে কোনো ভালো, সৃজনশীল এবং টেকসই উন্নয়ন আমলাতান্ত্রিক প্যাঁচে মার খাওয়ার দৃষ্টান্ত এ অঞ্চলে ভূরি ভূরি। কখনো কখনো দুর্বিপাকে পড়লে, রাজনীতিকরা এ আমলাতন্ত্রের লাগাম টানা দরকার মনে করেন। ক্ষমতায় যেতে পারলে, একটা বিহিত করবেন বলে শোনান। আদতে ক্ষমতায় যেতে আমলাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে, এ সন্ধি আরও পোক্ত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রস্তাবিত ২০৮টি সুপারিশ সেই আশাকে আরও জোরালো করেছিল। কিন্তু বদলি, পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এক একটি ঘটনায়, পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোরই জয়জয়কার। এর আগে তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিএনপি এ ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানা আনবে বলে একটা ধারণা জন্মেছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করায় ধারণাটি কারও কারও বিশ্বাসে রূপ নেয়। কিন্তু বাস্তবটা কঠিন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা বইছে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, ওএসডির পুরনো প্রবণতাও বহাল।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের কর্র্তৃত্বপরায়ণ শাসন টিকিয়ে রাখার ব্রত ছিল একঝাঁক আমলার। একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে তাদের দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ইনাম। মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সব স্তরেই প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। টানা তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৪-২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে, প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি। এসবের নীতি ও কাঠামোগত  বিহিত ছিল প্রত্যাশিত। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারি কর্মকর্তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি সার্ভিসের অধীনে থাকা সমিতিগুলোর কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে, সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা বা দাবি-দাওয়া আদায়ে বিক্ষোভ কিংবা প্রতিবাদ সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশগুলো সুপারি বাগানে পড়ে থাকার অবস্থায়। তিতা-মিঠা বাস্তবতাতেই ক্ষমতার চক্রায়ন। আমলাতন্ত্রের ইতিহাস প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলনিয়া, চীন ও ভারতের সুপ্রাচীন সভ্যতায় রাজাদের শাসনকার্য পরিচালনায় কর্মকর্তাদের ব্যবহারের মাধ্যমে শুরু হয় ১৮শ শতাব্দীতে।  ফ্রান্সে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়, পরে ইউরোপ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন চীনে যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং মিসরে ফেরাউনদের শাসনামলে রাজকীয় আদেশ বাস্তবায়নে আমলাদের ব্যবহার ছিল।

চীনের মতো ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসেও, সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ সাধারণত প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যের সাধারণ শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে করা হতো, যা আমলাদেরও একইভাবে অধিক মর্যাদা প্রদান করত। কেমব্রিজ-অক্সফোর্ডের সিভিল সার্ভিসের আদর্শ মানবতাবাদের মাধ্যমে বিশ্ব বিষয়ক সাধারণ শিক্ষার কনফুসীয় আদর্শের অনুরূপ।  বিংশ শতাব্দীরও অনেক আগে, ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ধ্রুপদী সাহিত্য, সাহিত্য, ইতিহাস এবং ভাষা ব্যাপকভাবে পছন্দের ছিল। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ‘ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস’-আইসিএস ছিল আধুনিক আমলাতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি, যা পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রভাব ফেলে। টিকেও আছে মহাদাপটে। ইন্টেরিমের দেড় বছরে পুরনো সুবিধাভোগী আমলাদের হটিয়ে নতুনভাবে দলীয় বা ভিন্নমতাবলম্বী আমলাদের পদায়ন একেবারে ওপেন সিক্রেট। চলেছে খাবলাখাবলির মতো। নির্বাচিত সরকার আসার পর ভিন্ন প্রেক্ষাপট। ভোল বদল। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ একাকার। বিএনপির খাস লোক রব সবার মধ্যে। গুপ্ত-সুপ্তে কে যে কার, বোঝা কঠিন তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সবখানে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে ছলে-বলে-কৌশলে বর্তমান ক্ষমতাসীন মন্ত্রী-এমপিদের মনোতুষ্টে মরিয়া কতক আমলা। মন্ত্রি-এমপিদের এতে বেশ ভালোই লাগছে। অন্য রকম এক সুখানুভূতি। এই আমলাচক্রের প্রতাপ ও কারসাজিতে যে তারা এক সময় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তা ভুলেই গেছেন। অথচ সিভিল প্রশাসনকে দুর্বৃত্তায়ন মুক্ত করার কঠিন কঠিন কথা ছিল তাদের। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনমনে আশা ছিল দুর্নীতিবাজ আমলারা বিচারের মুখমুখি হবে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এর বিপরীতে আমলাকুল ভেতরে ভেতরে যূথবদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনের আগ থেকেই তারা নিজেদের শ্রেণিগত গাঁথুনি সবল করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার দায়িত্বে থাকা আমলারা গোপনে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে মিতালি গড়েছেন। সফলও হয়েছেন। নতুন সরকারে পছন্দসই পদ-পদায়নে কামিয়াবি হয়েছেন। বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তিত পটভূমিতে এমন আমলাবাজি সামনে ভালো কিছুর বার্তা দেয় না। রাজনৈতিক দলীয় অনুগতদের দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকাঠামো ক্ষমতাসীনদের শাসনব্যবস্থায় ‘প্রভুত্বশীল’ মনস্তত্ত্ব তৈরি করলেও এ ব্যবস্থা থেকে এবারও মুক্তি মিলছে না, তা অনেকটা পরিষ্কার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা থেকে তৈরি হওয়া ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দেশের মানুষ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করল, নতুন সরকার গঠন করল, এর পর থেকে সেই পুরনো কাঠামো চিন্তাশীল মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে। নিজেদের অনুগত দলীয় আদর্শের লোকবল দিয়ে সরকার পরিচালনায় কি সরকার দিন শেষে সাফল্য পায়? বরং পরিণামের শিকার হয়। দলীয়করণ প্রশাসন হলে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতৈক্য তৈরিতে সুবিধা হয়। দ্বিতীয়ত, নিজ দলীয় এজেন্ডা কিংবা নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিপালন করতে গলদঘর্ম হতে হয় না। তৃতীয়ত, দলীয়করণ প্রশাসন থাকলে কেন্দ্রীয় নিদের্শনা অনুযায়ী নেটওয়ার্কিং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। এ ছাড়া দলীয়করণ প্রশাসন কার্যকরের ফলে দেশে নতুন করে ‘অনুগত’ কিংবা গৃহপালিত প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যেখানে ভিন্নমতের কিংবা আইডিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও বাস্তবায়নের সুযোগ মেলে না।

যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক স্থানে পদায়নের মাধ্যমে কেবল ক্ষমতা বা শাসন পোক্ত হয় না; দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনও সম্ভবপর হবে। একজন ব্যক্তির মেধা অবশ্যই যে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। ব্যক্তির রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় পছন্দ ও অপছন্দের প্রভাব কর্মক্ষেত্রে যেন না পড়ে, সে সংস্কৃতির বিকাশ আনতে হলে সরকারকে নতুন করে সুযোগ ও সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করতেই হবে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়া ব্যক্তিরা নিশ্চয় রাজনৈতিক, লিঙ্গ কিংবা ধর্মের পরিচয়ে পাস করেন না। বরং নিজেদের যোগ্যতার মাধ্যমে তারা দেশ পরিচালনার সুযোগ পান। এ সুযোগ পেয়েও তারা কেন উল্টাপাল্টা করেন? কেন পারেন না ক্ষমতা হজম করতে? জবাব আছে নানা ঘটনায়। ম্যাজিস্ট্রেট, ইউএনওকে স্যার বা ম্যাডাম সম্বোধন না করা কোনো কোনো প্রশাসনিক আমলার কাছে বড় অপরাধ। এর জেরে তীব্র তিরস্কার থেকে শুরু করে সঙ্গে থাকা লোকজন দিয়ে পিটিয়ে আহত করে দেওয়ার ঘটনাও দেখতে হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে আমলাদের ভীষণ অনীহা। অথচ প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে চাকরিতে প্রবেশের সময় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দিতে হয়। এরপর পাঁচ বছর অন্তর সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির বিবরণী নিয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দেওয়ার নিয়ম কি পালন হয়? উদাহরণের প্রয়োজনে চলে আসে সেই সুলতানার সালতানাৎ কায়েমের কথা। কুড়িগ্রামের সাবেক এই জেলা প্রশাসক ছোট্ট একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন, চেয়েছিলেন কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে সেটার নতুন নাম নিজ নামে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণ করতে। একজন জেলা প্রশাসকের জন্য সেই ‘সামান্য’ চাওয়াতেও বাদ সাধার কারণে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে বিবস্ত্র করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। অভিযোগ আনা হয়, তার বাড়িতে মদ ও গাঁজা পাওয়ার।

গত আমলে আমলাদের দেশোদ্ধার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে প্লেজার ট্যুরের ঘটনা এখনো বাসি হয়ে যায়নি। মন্ত্রণালয়ের কাজ শিকেয় তুলে, প্রায় সব ক্ষেত্রে অকারণে বিদেশ ভ্রমণ ছিল তাদের নিত্যকার রুটিন। বিদেশ সফরের কারণ দেখে যে কারও চক্ষু চড়কগাছ হবে নিশ্চিত। খিচুড়ি রান্না শিখতে, পুকুর খননে দক্ষতা অর্জন করতে, লিফট কিনতে, বিল্ডিং দেখতে, গরুর কৃত্রিম প্রজনন উন্নয়ন কার্যক্রম দেখতে, ট্যাংরা-পাবদার মতো দেশি মাছ চাষের বিদেশি প্রশিক্ষণ নিতে, তেলজাতীয় ফসলের চাষ শিখতে ও মৌ পালনে প্রশিক্ষণ নিতে, বোয়িং বিমান ডেলিভারি আনতে, ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন, নলকূপ খনন শিখতে পর্যন্ত বিদেশ গেছেন আমলারা। তোয়াজ-তোষণ পেতে থাকলে, সামনের দিনগুলোতে এমন বৈদেশিক ভ্রমণসহ আগের মতো নানা সুবিধা হাসিলে তারা আবার বলীয়ান হবেন। নিজেরা ভাসবেন, সরকারকে ডুবাবেন। আবার ঘটবে নতুন করে পুরনো কাণ্ডকীর্তি। ডুব-সাঁতারের এ জলকেলির অবসান ঘটবে, না আরও চাঙ্গা হবে সেই সিদ্ধান্তের অনেকটা নির্ভর করছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় আসা সরকারের ওপর।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

mostofa71@gmail.com