প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতায় সরকারের যাত্রার এক মাস

মাত্র এক মাসেই প্রতিশ্রুতির পথে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির সূচনা, ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবাইত ভাতা চালু, খাল পুনঃখননের মতো উদ্যোগগুলো সরকারের প্রথম মাসেই পরিবর্তনের বার্তা খুঁজছেন অনেকেই।

পাশাপাশি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফেরানো থেকে শুরু করে বাজার নিয়ন্ত্রণ, কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভিআইপি প্রটোকল কমানোর বিষয়গুলো ‘দিকনির্দেশনামূলক সূচনা’ হিসেবে দেখছেন তারা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সূচনাকে টেকসই সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন। পাশাপাশি দুর্নীতিকে শক্ত হাতে দমন করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সরকার গঠনের পর সংসদীয় দলের প্রথম সভায় বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দলটির কোনো এমপি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। আর তাতেই অভিনন্দন আসে জনগণের পক্ষ থেকে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি আবার চালু করে বিএনপি পাচ্ছে ভূয়সী প্রশংসা।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের দীর্ঘ পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাত্র কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড, বৃক্ষরোপণ ও খাল খনন কর্মসূচি সরকারকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী জনস্বার্থে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। কর্মপরিকল্পনা অনেক, সবগুলোই বাস্তবায়ন করা হবে।’

পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক মাসেই কিছু প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ লক্ষ করা গেছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি নিয়ে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করার যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ১০ মার্চ সব ধরনের রাজনৈতিক অপপ্রচার পেছনে ফেলে বিতরণ শুরু হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আগামী ১৪ এপ্রিল ১ বৈশাখ দেশের ৮টি জেলার ৯টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক এই কার্ড পাবেন।

একই সঙ্গে ইমাম ও পুরোহিত ভাতা চালু করার মাধ্যমে ধর্মীয় নেতাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সামাজিক সংহতির একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রচনার এই উদ্যোগ নাগরিক সমাজে আস্থা ও স্বস্তির জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। বাজার তদারকি, সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজরদারি এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, তবু বাজারে আতঙ্ক বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানোর ক্ষেত্রে সরকারের সক্রিয়তা অনেকের দৃষ্টিতে ইতিবাচক হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ এবং বর্তমানের সরকারের এক মাসের কার্যক্রম নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন ভালো উদ্যোগের পাশাপাশি সহযোগী হিসেবে যদি দক্ষ আমলাতন্ত্র বা জনপ্রশাসনকে সাজাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী, তবেই জনগণ উপকৃত হবেন। না হলে উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

তারা ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর উদ্যম জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন পর মানুষ নতুন করে আশাবাদী হচ্ছে। এটাও দেশের জন্য মঙ্গলজনক।

প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিজেই সকাল ৯টায় কর্মস্থলে পৌঁছে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভিআইপি প্রটোকল ছাড়া চলাচল এবং ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীতে জনদুর্ভোগ এড়াতে প্রধানমন্ত্রী যাত্রাপথে সড়কের দুই ধারে পুলিশের অবস্থানের যে নিয়ম, তা-ও বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে ১৩-১৪টি থেকে কমিয়ে চারটি করা হয়েছে।

সরকারপ্রধানের এমন সিদ্ধান্তে রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোয় যানবাহনের গতি বেড়েছে।

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ মাসের শুরুতে ভারত সফর করে এসেছেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী।

সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ ভারতের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনীতিক সম্পর্কে আড়াই বছর ধরে যে বরফ জমে, মেজর জেনারেল কায়সার রশিদের এই সফরে তা গলার আভাস দেখছে ভারতের সংবাদপত্রগুলো।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও তেল সরবরাহ সংকট মোকাবিলা করতে শুরুতে বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয় বলে দাবি করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সরকারের এক মাসের কর্মপদ্ধতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিষয়ে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের শুরুটা ভালো। সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচি দিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে হাঁটা শুরু করেছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেকোনো প্রকল্প বা ভালো কাজ তড়িঘড়িতে যেন নষ্ট না হয়। অতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে গেলে সঠিক মূল্যায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সরকারকে এসবদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সূচনা, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখার প্রচেষ্টা শুরুটা ভালোই হয়েছে। সামনে বড় একটা পথ পাড়ি দিতে হবে সরকারকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাঁদাবাজদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে ব্যবসায়ী মহল স্বাগত জানিয়েছে এবং তারা মনে করছেন, চাঁদাবাজি কমলে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে দেশের মানুষ একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব চিত্র দেখতে পাবে।