কৌশলগত সমাধান কর্মসংস্থানের

এক বছরের মধ্যে ন্যূনতম ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলেও  সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন ও ব্যক্তিগত আন্তরিক উদ্যোগে এটি সম্ভব। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে বাস্তব চ্যালেঞ্জ, কৌশলগত সমাধান এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করা দরকার। বাংলাদেশে বেকারত্বের সংখ্যা প্রতিবছর বেড়ে চলেছে। বিগত সরকারগুলো বেকারত্বের হার তেমন নিম্নমুখী করতে পারেনি। ফলে এর অশুভ পরিণতি অর্থনীতিকে গ্রাস করে চলেছে। দেশে আরএমজি (readymade garments) রপ্তানি গত ১৫ বছরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে। শিল্প খাত বার্ষিক গড় ১০ শতাংশ বৃদ্ধির পরও, অন্তত ১.৪ মিলিয়ন কাজ নষ্ট হয়েছে গত দশকে। উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৩ থেকে ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব ৯.৭ শতাংশ থেকে ২৭.৮ শতাংশে বেড়েছে। এ তথ্য প্রমাণ করে,  অর্থনৈতিক বৃদ্ধি শুধু মোট আয়ের (GDP) বৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, কিন্তু তা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অনুপাতে পরিণত হচ্ছে না। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতিতে ‘jobless growth’-এর প্রকট বাস্তবতা রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ ক্ষেত্র ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এজন্য রপ্তানিমুখী শিল্পের শক্তি বজায় রাখা ও Ready-Made Garments (RMG) খাতের শক্তি ধরে রাখতে হবে ও আপগ্রেডেশন দরকার। RMG এখনো দেশের রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি এবং আনুমানিক ৮ মিলিয়ন কর্মী এখানে নিযুক্ত। নানাবিধ উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্য বাড়ানো পণ্য তৈরি হলে, শ্রম প্রবেশের সুযোগ বেড়ে যাবে।

সরকার ও বেসরকারি অংশগ্রহণে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক মান (compliance) অর্জনের জন্য অনুদান দিয়ে, অধিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যেতে পারে। ফলে পোশাক শিল্পের গতিবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ‘Export Readiness Fund’ প্রোগ্রাম টার্গেটেড ফার্মে লগ্নি ও মান অনুসরণের মাধ্যমে প্রায় ১৮০,০০০ নুতন চাকরি সৃষ্টি করেছে। রপ্তানির বহুমুখীকরণে (Export Diversification) প্রস্তুত পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য চামড়া পণ্য, ফুটওয়্যার, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদি খাতে বৈদেশিক চাহিদা বাড়ছে। এসব খাতে নতুন শিল্প গড়ে উঠলে শুধু নির্দিষ্ট আয় বাড়বে না, বরং কর্মসংস্থান সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। ভারতের মতো বাজার থেকে আগ্রহী বিনিয়োগকারী তখন বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে এবং দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে। তথ্যপ্রযুক্তি (IT) ও ডিজিটাল অর্থনীতি, রেডিমেড গার্মেন্টসের পরে হতে পারে বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম ক্ষেত্র। এ জন্য সঠিক কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের আইটি খাতে দ্রুত বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং freelancing, outsourcing-এর মাধ্যমেও আন্তর্জাতিক আয় অর্জিত হচ্ছে। যদিও এখনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তবু এই খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে, যদি নীতি-উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। কীভাবে ১ কোটি চাকরি সৃষ্টি হবে IT খাতে? এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোর্সে রূপান্তর করতে হবে। ট্যাক্স ইনসেনটিভ, বুদ্ধিমান অঞ্চল স্থাপন ও গ্লোবাল IT ফার্মগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপে অগ্রসর হতে হবে। IT খাতে যদি বছরে সরকারি- বেসরকারি প্রযুক্তিগত উদ্যোগে মিলিয়ে ৩০-৫০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তবে এটি দেশের শ্রমশক্তিকে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করবে। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে SMEs-এর যোগ্যতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কৃষি ও কৃষি শিল্প, কুটির শিল্পে নিত্যনতুন উদ্ভাবন এবং বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করা দরকার।

এজন্য নীতি-পরিচালনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশল, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিভিন্ন সেক্টরকে সমন্বয় সাধন করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের সাযুজ্য রাখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া যুবকরা যেন বাজার-প্রাসঙ্গিক দক্ষতা নিয়ে আসে, সে ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। Start-Up  ও গিগ-ইকোনমির জন্য ট্যাক্স সুবিধা, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন উদ্যোগে জনগণকে আকর্ষণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কর্মসংস্থান বৃদ্ধির যে কোনো চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি-সমর্থিত কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি-বহুমুখী পণ্যকে সমর্থন করতে হবে। এ জন্য ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (FDI) আকর্ষণ, ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আনতে ব্যর্থ হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উচ্চভিলাষী পরিকল্পনা কখনো সফল হবে না। নতুন বাজার, রপ্তানি বহুমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি এগুলো RMG ছাড়াও অন্যান্য সেক্টরকে কেন্দ্র করের তৈরি করতে হবে। রেডিমেড গার্মেন্টস ছাড়া অন্যান্য সেক্টরকে যদি ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের আওতায় আনা না যায়, তাহলে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুরূহ হবে।

এক বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান করতে হলে, ধাপে ধাপে কৌশল এবং লক্ষ্য অনুসারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য RMG শক্তিশালী/মান উন্নয়ন ২০-৩০ লাখ,  IT & ITES  রপ্তানি/ outsourcing ৩০-৫০ লাখ, নতুন রপ্তানি শিল্প (leather, footwear) ১০-২০ লাখ, SMEs ও ডিজিটাল উদ্যোগ ১৫-২৫ লাখ, কৃষি + গিগ-ইকোনমি ১০-২৫ লাখ মিলিয়ে সর্বমোট সমন্বিত নীতি দিয়ে বাস্তবায়িত হবে ১০০ মিলিয়ন প্লাস। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে বছরের মধ্যে ন্যূনতম ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। যদি সরকার, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমন্বয়ে, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একটি কার্যকর নীতি-সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে, বিশেষ করে রপ্তানির বহুমুখীকরণ, IT-খাত, SMEs-এর শক্তি বৃদ্ধি ও দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা হলে, এক বছরের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য অর্জিত হবে। এটি শুধু বেকারত্ব কমাবে না বরং মূল্য সংযোজন, বৈদেশিক আয় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে। এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যক।

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড আইটি কনসাল্টিং লিমিটেড
       waliur7@gmail.com