রমজানের শিক্ষায় নতুন আশার আলো

রমজান মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। দীর্ঘ এক মাসের রোজা পালন মানুষের অন্তরে তাকওয়ার বীজ বপন করে, যা তাকে পাপাচার ছেড়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। রমজানের এ প্রশিক্ষণ সবাইকে ধৈর্য, সততা ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, যা একজন আদর্শ নাগরিক ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য। ব্যক্তিগত আমল ও ইবাদতের পাশাপাশি রমজানের বড় সার্থকতা হলো সামাজিক শুদ্ধি। সমাজে যখন সৎ ও নীতিবান মানুষের আকাল পড়ে, তখন রমজানের শিক্ষা আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখায়। লোভ, লালসা ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি ন্যায়নিষ্ঠ সমাজ গঠনে এ মাসের প্রভাব অপরিসীম। বিশেষ করে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন মানুষের বিকল্প নেই। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এ মাস আমাদের সেই কাক্সিক্ষত পথে ফেরার সুযোগ করে দেয়। প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ মাসটিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা।

রোজা রাখা অবস্থায় একজন মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে ইবাদতের মধ্য দিয়ে পার করতেই ব্যাকুল থাকে। তার ভেতরে আগের দিনের তুলনায় আরও ভালো হওয়ার তাগিদ থাকে। বহু মানুষ পাওয়া যাবে, যারা রোজা উপলক্ষে মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া শুরু করেন এবং বছর জুড়ে এ চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য নিজের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিতে লিপ্ত হন। রোজা উপলক্ষে অনেকে দাড়ি রাখতে শুরু করেন। রোজায় অনেক মানুষ প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস করেন, অনেকেই কোরআন খতম দেন। বছরের অন্য কোনো মাসে এমনটা হয় না। মানুষ এ মাসটিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক আমল করতে আগ্রহী হয়, কারণ রোজার মাসে এসব আমল করলে বছরের অন্য সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়। তাছাড়া এ মাসে এসব ইবাদতের কারণে সংশ্লিষ্ট আমলদার ব্যক্তির মাঝে বছর জুড়ে আমল করার ইচ্ছা তৈরি হয়।

পবিত্র কোরআনে মুমিন বান্দার যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে একটি হলো রোজা রাখা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ ও রোজা পালনকারী নারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী পুরুষ ও সুরক্ষাকারী নারী এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও স্মরণকারী নারী, তাদের সবার জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (সুরা আহজাব ৩৫)

রমজান মাসের রোজা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাসম্পন্ন। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি রমজান মাসে রোজা পালন করা। আল্লাহতায়ালা শুধু যে আমাদের ওপর অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদির ওপরই রোজা পালন করার আদেশ জারি করেছেন, তা নয়। পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও সম্প্রদায়কেও আল্লাহ রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য একটিই, যাতে মুমিন বান্দারা আরও বেশি তাকওয়ার গুণে সমৃদ্ধ হতে পারে। রোজাকে নিয়মিতভাবে সব জাতির ওপর বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি বড় কারণ হলো রোজার বহুমুখী উপকারিতা।

এক কথায় বলা যায়, রোজা হলো মুসলিমদের জন্য প্রশিক্ষণকাল। আমরা প্রায়ই বলি, ‘আমরা গুনাহগার, অনেক কিছুই যেভাবে করা উচিত করতে পারছি না।’ এসব অপরাধের জন্য আমাদের আবার নানা ধরনের অজুহাত দেওয়ারও চেষ্টা থাকে। রোজার মাসে আমাদের সবার ভালো মুসলিম হয়ে ওঠার চেষ্টা থাকা উচিত। সব অজুহাত জয় করার প্রয়াস জারি রাখা উচিত। একজন ভালো মুসলিম মানেই ভালো ও উত্তম একজন মানুষ। আমরা বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি, তাতে স্পষ্ট যে, এ দেশে সবচেয়ে বড় অভাব হলো ভালো মানুষের। আমাদের অনেক ইতিবাচক আকাক্সক্ষা, সুপরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে সৎ মানুষের অভাবে।

আমরা যদি দেশকে এগিয়ে নিতে চাই তাহলে সৎ ও নৈতিকতার মানে উত্তীর্ণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আর এ ক্ষেত্রে রমজান মাস হলো সবচেয়ে কার্যকরী মাস, যে মাসটি সহজাতভাবেই সৎ, ভালো ও নীতিবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরির সুযোগ করে দেয়। অপশাসনমুক্ত এ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবেই এবারের রমজান মাসটি তাই অনেক বেশি মহিমান্বিত পন্থায় উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের নিপীড়িত ও মজলুম মুসলিমদের কথা ভেবে অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। দোয়া করি, আল্লাহতায়ালা তার কুদরত দিয়ে এ অসহায় মানুষদের হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক