জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ ৪০টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, বিগত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। জরুরি প্রয়োজনে জারি করা এসব অধ্যাদেশ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হতে পারে।
এদিকে, বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়ার অধ্যাদেশ সরকারি দল গ্রহণ করবে। অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে ফয়সালা করতেই সংসদের বিশেষ কমিটি বৈঠক। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাগুলোকে আমরা ধারণ করব। কিছু অধ্যাদেশ আছে যেখানে জুলাই যোদ্ধাদের যেই নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং গণঅভ্যুত্থানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে ও অংশগ্রহণ করেছে তাদের ইনডেমনিটি দেওয়ার বিষয় আছে, সেগুলো আমরা গ্রহণ করব। আরও কিছু বিষয় আছে যেমন বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল তাদের নেতাদের নামে এবং বিভিন্ন নামে সেগুলো বিলুপ্ত করা হয়েছে, এগুলোকে আমরা গ্রহণ করব।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আরও অনেক অধ্যাদেশ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে কোনটা কীভাবে গ্রহণ করা যায়; কোনটা সংশোধনীসহ গ্রহণ করা যায় আর কোনটাতে পরে আরও সংশোধনী আনতে হবে সেটা সেভাবেই ফয়সালা করতে হবে। তিনি বলেন, সময় সংক্ষিপ্ত। এসব ৩০ দিনের মধ্যে ফয়সালা করার বাধ্যবাধকতা আছে। আমাদের প্রথম অধিবেশন গত ১২ তারিখ বসেছিল। পরবর্তী অধিবেশন আগামী ২৯ তারিখ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ দিনের মতো সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে। বাকি ১৫ দিনের মধ্যে যা করা যায় তার ব্যবস্থা করব।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সময়ের প্রয়োজনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ তখন জারি করেছিল। এখন সেগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদ বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। আজকে অর্ধেকেরও কিছু কম হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। কিছু বিষয়ের ওপর দুই-একজন সদস্যের কিছু মতামত আছে, সেগুলো পরবর্তী সভায় আলোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে লিখিত মতামতও নেওয়া হবে। কমিটি আজ দুপুর ২টায় ফের বৈঠকে বসবে। সবগুলো অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আগামী ২ এপ্রিল মধ্যে বিশেষ কমিটি সংসদে প্রতিবেদন জমা দেবে।
সংসদ সচিবালয়ের উপপরিচালক (গণসংযোগ) মো. সাব্বির মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং মোনাজাত করা হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা হওয়া ৪০টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী সংশোধন, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ সংশোধন, বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন সংশোধন এবং বাংলাদেশ বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল রহিতকরণ অধ্যাদেশ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং নিয়োগের বয়সসীমা নির্ধারণসংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেসব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে আছে জাতির পিতার পরিবার-সদস্যদের নিরাপত্তা রহিতকরণ, সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার দুটি অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ।
এ ছাড়া ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী সংশোধন অধ্যাদেশ, বন ও বৃক্ষসংরক্ষণ অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন অধ্যাদেশ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, নারী ও শিশুনির্যাতন দমন সংশোধন অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল সংশোধন অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি সংশোধন অধ্যাদেশ, মাছ সংরক্ষণ সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশ, শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সংশোধন অধ্যাদেশ, বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন সংশোধন অধ্যাদেশ, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সংশোধনের দুটি অধ্যাদেশ, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট সংশোধন অধ্যাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার সংশোধন অধ্যাদেশ, পরিত্যক্ত বাড়ি সম্পূরক বিধানাবলি সংশোধন অধ্যাদেশ, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, রংপুর উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ এবং স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ নিয়ে আলেচনা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, পরবর্তী বৈঠকে বাকি অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। অধ্যাদেশগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যথার্থতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। মির্জা আব্বাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকায় বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করেন। পরে তার প্রস্তাবে অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়।