গত বুধবার দৌলতদিয়ায় পদ্মার গভীর পানিতে ডুবে যায় একটি বাস; কিন্তু তার চেয়েও গভীরে তলিয়ে গেছে এক পরিবারের সব স্বপ্ন, হাসি আর বেঁচে থাকার কারণ। কয়েক মুহূর্তের ওই দুর্ঘটনায় চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে ১১ বছরের ফাইজা মাহনুর রিদা, যে ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, একমাত্র পৃথিবী।
ঢাকার মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির নীহারিকা শাখার মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল ফাইজা। গ্রামের বাড়িতে ঈদের আনন্দ শেষে বাবা বিল্লাল হোসাইন ও মা শিউলি খাতুনের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল সে। ডুবে যাওয়ার আগে ফেরির জন্য অপেক্ষায় থাকার সময় বিল্লাল বাস থেকে নেমে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের পলকে বাসটি পড়ে যায় পদ্মার গভীর পানিতে। ডুবে যাওয়া বাস থেকে কোনোমতে বের হয়ে শিউলি আক্তার বাঁচলেও চিরতরে হারিয়ে গেছে তাদের একমাত্র সন্তান ফাইজা।
আগামী রবিবার থেকে তার নিয়মিত ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে দারুণ সময় কাটানোর। বড় হয়ে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার স্বপ্ন দেখত শান্ত, মিষ্টি মেয়ে ফাইজা। কিন্তু সবই এখন শুধু স্মৃতির অংশ। সবাইকে কাঁদিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল সে।
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বিল্লাল হোসাইন ও শিউলি খাতুন। মেয়ে নিয়েই যার সারাদিন কাটে, সেই মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়া শিউলিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যখন নদীতে পড়ে যায়, তখন বাসের পেছনে পাগলের মতো দৌড় দেন বিল্লাল। নিরুপায় হয়ে দিগভ্রান্ত হয়ে সাহায্যের জন্য ছুটেছেন। কিন্তু তখন কারোরই কিছু করার ছিল না। কিছুক্ষণ পর স্ত্রীকে পেলেও মেয়েকে না পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন ‘গাড়িতে আমার মেয়ে আছে ভাই।’
বিল্লাল হোসাইন ঢাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীর ভবানীপুর গ্রামে। গতকাল দুপুরের দিকে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় বিল্লাল হোসাইনের। তিনি বলছিলেন, ‘ঈদের ছুটি শেষে স্ত্রী-সন্তান ও চাচাতো ভাইকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলাম। আমাদের গাড়িটি প্রথমবার একটি ফেরিতে উঠতে না পেরে নদীর তীরেই অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর একটি ফেরি আসে। আমি এবং আমার চাচাতো ভাই তখন গাড়ি থেকে নেমে নিচে দাঁড়ান। আমাদের বাসের চালক ফেরি থেকে নেমে আসা যানবাহনের জায়গা দিতে গাড়ি স্টার্ট দেন। মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সোজা নদীর মধ্যে গিয়ে পড়ে।’
‘আমি তখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে হয় আমি আর দুনিয়াতে নেই। পাগলের মধ্যে ছুটছি। কয়েক মিনিট পর আমার স্ত্রীকে পানি থেকে উদ্ধার করা হলো অজ্ঞান অবস্থায়। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে জ্ঞান ফিরে পান তিনি। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ যখন বাসটি উদ্ধার করল, তখন সেই বাসের মধ্যেই আমার মেয়ের লাশ পাওয়া যায়,’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন তিনি।
ফাইজা মাহনুরের লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে তার গ্রামের বাড়িতে জানাজা পড়ানো হয়। এরপর তার নানার বাড়ি মানিকগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা শেষে সেখানেই দাফন করা হয় গতকাল বৃহস্পতিবার।
ফাইজার পরিবারের পাশাপাশি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলছে শোকের মাতম। গভীর শোক ও ফাইজার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিবৃতি দিয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিল্লাল হোসাইনের বাল্যবন্ধু রেজাউর রহমান রিজভী, যিনি ঢাকায় ন্যাশনাল ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। রিজভী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসময় তার সন্তান ফাইজার সহপাঠী ছিল। অসম্ভব মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিল ফাইজা। হঠাৎ এমন দুর্ঘটনার খবর শুনে আমরা সবাই খুবই মর্মাহত। সবসময় চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিষ্পাপ মেয়েটার মুখ।’
‘ফাইজার মায়ের সারাদিন কাটত তার মেয়েকে ঘিরে। স্কুলে নিয়ে যাওয়া, আসা সব তিনিই করতেন। সারাক্ষণ এখন তিনি ফাইজা ফাইজা করে চিৎকার করছেন। আর তার বাবা বিল্লাল তো গভীর শোকে একপ্রকার পাথর হয়ে গেছেন,’ যোগ করেন তিনি।
রিজভী জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসের ভেতর থাকা ফাইজার পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র এখনো ফেরত দেয়নি পুলিশ। সেগুলো পেলেও স্মৃতি হিসেবে পরম যতেœ তা আগলে রাখতেন তার বাবা-মা।
খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে ফাইজার বাবা বিল্লাল হোসাইন বলছিলেন, ‘ফেরিতে ওঠার ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী বাসের প্রাধান্য খুবই কম দেওয়া হয়, যা খুবই অনুচিত। প্রথমবার আমাদের বাসটি ফেরিতে উঠতে গিয়েও তা পারেনি। কারণ তিনটা বাস ও একটা ট্রাক ছাড়া বাকিগুলো ছিল ব্যক্তিগত গাড়ি। যেন ৪০-৫০ জন যাত্রীর চেয়ে দু-চারজন যাত্রীর গুরুত্ব তাদের কাছে বেশি। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার।’