জ্বালানিতে অস্থিরতা

জ্বালানি সংকট সবার চোখের সামনে ঘটে চলেছে, কিন্তু কেউ সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস, কৃষি, পর্যটন, পরিবহন এবং জেট ফুয়েল মিলিয়ে বর্তমান সংকট সবাইকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলেছে। এর অভিঘাত দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও উৎপাদনে ফেলতে যাচ্ছে অপপ্রভাব। এই ভোগান্তির একটি নমুনা ছবি মিডিয়ার সবক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি তাহলো তেলের পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল ও মোটরগাড়ির লাইন দেখে। যেন হাহাকার পড়েছে জ্বালানি বাজারে। পাম্পগুলোতে ডিজেল আছে তো অকটেন নেই, পেট্রোলও এতদিন রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছিল। সরকার বলছে, পর্যাপ্ত তেল আছে। চট্টগ্রামের জেটিতে কার্গো এসেছে, তেল খালাস হচ্ছে, ঘাটতি নেই। তবু ব্যবহারকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখানে একটি তথ্য দেওয়া যেতে পারে, দাম বেশি দিলে খোলাবাজারে মিলছে পেট্রোল, ডিজেল। কালোবাজারিদের হাতে তেল কারা দিচ্ছে? সোজা বাংলায় বললে দিচ্ছে পাম্প মালিকরাই। তাদের সিন্ডিকেট এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তেল বেশি দামে বিক্রি করার নানা ফন্দির মধ্যে এটা এক পথ। যতটা না সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা, তার চেয়ে বেশি এই দুর্বিপাকে ফেলে টু-পাইস কামিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। এই দুর্বৃত্তায়নের পেছনে কাজ করছে, সরকারের আলগা নজরদারি ও তেল বিক্রেতাদের সংঘবদ্ধতার টুঁটি চেপে না ধরা। কালোবাজারে যাতে তেল বিক্রি করতে না পারে কোনো পাম্প মালিক সেটা মনিটরিং করা জরুরি।

আতঙ্কিত হয়ে যেসব গাড়ির মালিক ও মোটরসাইলের মালিক বারবার তেল নিতে পাম্পে যাচ্ছেন, সেই পরিস্থিতিও অন্যদের প্রভাবিত করে। প্রতিটি পাম্পে কত লিটার জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে, সেই সুতা ধরে তারা যেসব গাড়ি ও মোটরসাইকেলে জ্বালানি বিক্রি করেছেন, তার হিসাব নিলেই ফাঁক বেরিয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি কিনে আনা হচ্ছে উচ্চমূল্যে, দেশের ডলার বাড়তি খরচ হচ্ছে, অতএব এর ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। সেই সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে। প্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল সীমিত করা যেতে পারে সংকট উত্তরণের আগ পর্যন্ত। কিন্তু কৃষি, গণপরিবহন যা যাতায়াতকে সহজ ও স্বাভাবিক রাখে, তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। জ্বালানি সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ভব্যিষতে এ রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। অ্যাভিয়েশন সেক্টরে টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি তখনই স্বাভাবিক হবে, যখন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ত্রিমুখী যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, ওই সব দেশ থেকে সব ধরনের জ্বালানির আগমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই সামরিক পরিস্থিতি মনে রাখতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের জ্বালানির এলএনজি আসে কাতার থেকে। সেই স্থাপনা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি-কার্গো আসতে পারছে না।

সরকার অবশ্য আফ্রিকা মহাদেশ থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিকল্প হিসেবে ব্রুনাই দারুসসালামসহ পূর্ব দিগন্তের দিকে হাত বাড়িয়েছে। একে একটি সুপরিকল্পনা বলতে পারি। বহুমুখী জ্বালানি সংগ্রহের তৎপরতা অব্যাহত রাখা উৎসাহব্যঞ্জক। হরমুজ প্রণালি আমাদের জন্য খুলে দেওয়া হলেও বিকল্প ব্যবস্থাই আমাদের জ্বালানি চাহিদাকে মেটাতে পারে। এটা মনে রাখতে হবে, দেশের কৃষি উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ যাতে ব্যাহত না হয়, এটাই আমাদের লাইফ লাইনের সেক্টর। অ্যাভিয়েশনের বিরতি তেমন ক্ষতি আনবে না। ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে রেশনিং উপকারে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেমে গেলে জ্বালানি সংকট থাকবে না, এই নিশ্চয়তার আশা আছে। তবে জ্বালানি ব্যবহারকারীদের এটা মনে রাখতে হবে, সংকটে পড়ে আমাদের যে কী পরিমাণ অর্থ বেশি খরচ হয়েছে, যার দরুন আইএমএফের কাছে আপৎকালীন ঋণ চেয়েছে সরকার।