মোগল আমলে বাংলার রাজধানী ছিল ঢাকা। মোগলদের সুবেদার, আমির-উমরাহদের আবাসও ছিল ঢাকায়। ঢাকার মোগল স্থাপনাগুলোর অনেক নিদর্শন বর্তমানেও রয়েছে। নবাব মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করার ফলে ঢাকার ঐতিহ্যে ভাটা পড়ে যায়। তবে ঢাকাকে দ্বিতীয় রাজধানীর মর্যাদা দেওয়ার ফলে ঢাকার মান কিছুটা রক্ষা হয়। ঢাকার বিখ্যাত মসলিম বস্ত্র, তাঁতসহ বস্ত্রশিল্পকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তাঁতশিল্পের কারিগরদের আঙুল কেটে পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের তাঁতিদের তাঁত শিল্প থেকে বিচ্যুত করা হয়। উৎপাদক থেকে আমরা পরিণত হয়ে যাই ব্রিটিশ পণ্যের ক্রেতা হিসেবে। ব্রিটিশ পণ্যের বাজারজাত করার অভিপ্রায়েই ইংরেজরা এমন নৃশংস পন্থা গ্রহণ করেছিল। ওদিকে আমাদের কাঁচামাল জাহাজ বোঝাই করে নিজ দেশে নিয়ে পণ্য উৎপাদন করে আমাদেরই ওই পণ্যের ক্রেতায় পরিণত করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বন্দরের সুবিধা বিবেচনায় সুতানটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা নামক তিনটি গ্রামকে নিয়ে লন্ডনের আদলে গড়ে তোলে কলকাতা নগর। ইংরেজ শাসনাধীনে অখ- বাংলার পূর্ব বাংলা হয়ে পড়েছিল অবহেলিত এক পশ্চাৎপদ জনপদ। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার সমৃদ্ধি বৃদ্ধির ফলে পূর্ব বাংলা পশ্চিম বাংলার অধীন হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলার বস্ত্রশিল্পসহ নানা সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটিয়ে ইংরেজ শাসকরা পূর্ব বাংলাকে কৃষিনির্ভর হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। পশ্চিম বাংলার স্থানীয় বাঙালিরা পূর্ববঙ্গীয়দের সম্পর্কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য মনোভাব পোষণ করত। তার নজির আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় পর্যন্ত জেনেছি। করোনার পূর্বে শান্তিপুর লোকাল ট্রেনে ফুলিয়া থেকে শিয়ালদা ফেরার পথে ট্রেনে জনৈক শান্তিপুরের স্থানীয় এক ব্যক্তি চিৎকার করে কটূক্তি করেছিলেন। তিনি কেন অমন কথা বলছেন, জানতে চাইলে বলেছিলেন অনেক কথা। তার কথার সার-সংক্ষেপ ছিল, তার পিতার শান্তিপুরে তিন বিঘা সম্পত্তি ছিল। সাতচল্লিশের দেশভাগে পূর্ব বাংলা প্রত্যাগত মানুষেরা তার পিতার হাত-পা ধরে দুই কাঠা, তিন কাঠা করে আড়াই বিঘা জায়গা কিনে নেয়। এতে তাদের পাঁচ কাঠার ওপর বসতভিটায় বসবাস করতে হচ্ছে। আর পৈতৃক জায়গায় বসবাস করা বাঙালদের দাপটে তাদের চুপসে থাকতে হয়। একজনের সঙ্গে বিবাদ হলে বাঁদরের ন্যায় সবাই একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালদের দাপটে তাদের কোণঠাসা দশা।
১৯৮৬ সালে কলকাতায় স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। প্রথমজন প্রায় নব্বই বছর বয়সী ক্ষিতিশ চন্দ্র ধর। তিনি পূর্ব বাংলা এবং পূর্ববঙ্গীয়দের সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক এমন সব কথা বলেছিলেন তাতে বিষন্ন হয়েছিলাম। তার কথাগুলো ছিল এরূপ : পশ্চিম বাংলাই নানাভাবে পূর্ব বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। পূর্ব বাংলার মানুষদের শিক্ষা ও জীবিকার জন্য কলকাতামুখী হতে হয়েছে। পূর্ব বাংলা আগাগোড়া পশ্চিম বাংলার ওপর নির্ভরশীল ছিল। পূর্ব বাংলা সভ্য মানুষের বসবাসযোগ্য ছিল না। খাল-বিল, নদ-নদী, জলাশয়, কাদা-মাটিতে লেপ্টে থাকা পূর্ববঙ্গ অখন্ড বাংলার এক পশ্চাৎপদ জনপদ। সাতচল্লিশের দেশভাগে পূর্ববঙ্গীয় উদ্বাস্তুদের কারণে তাদের মরণদশা হয়েছিল। বাঙালদের চাপের ওই কুফল তারা আজ অবধি ভোগ করছে। দুই বাংলার সংস্কৃতিগত পার্থক্য জ্বাজল্যমান, পশ্চিম অগ্রে, পূর্ব পশ্চাতে। পূর্ববঙ্গীয়দের সম্পর্কে তার ধারণা অত্যন্ত নিম্নস্তরের। পশ্চিম বাংলার মানুষদের পূর্ব বাংলায় যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। পূর্ব বাংলার বাঙালদের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহও ছিল না। শিক্ষা, সংস্কৃতিতে পিছিয়ে থাকা পূর্ব বাংলা তাদের নিকট তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের প্রতীক। ভাষা ও সংস্কৃতিগত কারণে পূর্ববঙ্গীয়দের তারা বাঙালির স্থলে ‘বাঙাল’ বলত। অবশ্য পূর্ববঙ্গীয়রাও তাদের ‘ঘটি’ বলে উপহাস করা শুরু করে। দুই বাংলার মানুষের মাঝে প্রত্যক্ষ বিরোধ-বিবাদ নেই সত্য কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈপরীত্য কিন্তু উভয়ের মাঝে বিরাজ করে আসছে।
পূর্ববঙ্গীয়দের সম্পর্কে ক্রমাগত নেতিবাচক কথায় তাকে আমি বলেছিলাম, আজকের পশ্চিম বাংলার খ্যাতিমান লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক, অভিনয় শিল্পী, রাজনীতিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী সবার ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু পূর্ববঙ্গীয়। তিনি দমার পাত্র নন। জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘তারা এখানে আসার ফলেই ঋদ্ধ হতে পেরেছে। আমাদের সংস্পর্শে না এলে কুলি, কামার, মজুর, চাষাই থাকত।’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে ভারত বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।’ আমরা বাংলাভাষী রাষ্ট্রের নাগরিক। একজন বাঙালি হিসেবে আপনার তো গর্ব করা উচিত? এই প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো আমি প্রথমে ভারতীয়। তারপর অন্যকিছু।’ আমি তাকে মনে করিয়ে দিই খ্যাতিমান গায়ক, সুরকার শচীন দেববর্মণ বাঙাল ভাষায় জীবনভর কথা বলেছেন। এতে তো তার সৃজনশীলতায় কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি? তিনি আমাকে থামিয়ে বলেন, ‘ভুল বকছো কেন? শচীন কর্তা বাঙাল বা বাঙালি নন। তিনি ত্রিপুরার রাজাদের বংশধর এবং জাতিতে বোরো বা ত্রিপুরী। বাল্যকাল থেকে কুমিল্লায় থাকার ফলে বাঙালদের সংশ্রবে বাঙাল ভাষায় অভ্যস্ত হয়েছেন। ত্রিপুরায় থাকলে ককবরক কিংবা বোরো ভাষাই জানতেন।’
তার সঙ্গে নানা প্রসঙ্গে কথা বলে যে ধারণা জন্মে ওই যে শোনা কথা তা কিছুই মিথ্যা নয়। মনোজগতের বৈরী ছায়া জীবনাচার ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয় এবং বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে দৃশ্যমান হয়। অন্যদের নিয়ে বিষোদ্গার এরই খণ্ডিত অংশ। এটা এক ধরনের মানসিক বৈকল্যেরও প্রকাশ বলা যায়। যে ভদ্রলোকটি বাঙাল কিংবা বাঙালির মধ্যকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিষোদ্গার করছিলেন তাতেও তার মনোজগতের বৈরি ছায়াই প্রতিফলিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয়রা আমাদের সম্পর্কে কীরূপ ধারণা পোষণ করতেন তার চিত্রটি সেই ১৯৮৬ সালে পেয়েছিলাম।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত