গ্যাস বিস্ফোরণ

ঝুঁকি ও অব্যবস্থাপনা দূর হোক

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

গ্যাসের বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটছেই। একই সঙ্গে তা এখন আরও বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ক্ষতি ও ক্ষতের পরিসর বাড়ার প্রেক্ষাপটে। বিস্ময়কর হলো, একেকটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা ‘দোষী’ অনুসন্ধানে তাৎক্ষণিক তৎপরতা দেখালেও শেষ পর্যন্ত এর প্রতিবিধান কিছুই হচ্ছে না! ২৯ আগস্ট দেশ রূপান্তরে এরই উদ্বেগজনক চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিতাস গ্যাস ও বাড়িওয়ালারা এত বড় সংকট জিইয়ে রেখেও কীভাবে রয়েছেন অস্পর্শিত। ওই অনুসন্ধানে তিতাস গ্যাস, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর ঔদাসীন্য ও দায়িত্বহীনতার প্রশ্নবোধক চিত্র উঠে আসার পাশাপাশি গ্রাহক বা ভোক্তাদের আতঙ্ক-মর্মস্পর্শিতাও জানা গেছে। সমস্যাটি নতুন নয় এবং এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে এত আলোচনার পরও তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ ও বাড়িওয়ালাদের নির্বিকারত্ব বিস্ময়কর! গ্যাস লাইনের ত্রুটির দায় উভয় পক্ষের হলেও অবহেলাজনিত মৃত্যুর দায়মুক্ত থেকে যাচ্ছে তারা। বাড়িওয়ালা নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ^াস দিলেও শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখে না। তা ছাড়া জীবনের ক্ষয়ক্ষতি তো ক্ষতিপূরণে অনেকাংশেই পূরণ হওয়ারও নয়। দরকার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। 

সারা দেশে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকা- বেড়েই চলেছে। মৃত্যু, দগ্ধ হওয়া ও ক্ষতির চিত্রও স্ফীত হচ্ছে। শুধু যে গ্যাস সঞ্চালন লাইনেই ত্রুটি রয়েছে তা-ই নয়, গ্যাস সিলিন্ডারও মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও সিলিন্ডারের সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে এক হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটে। এর আগের বছর ঘটে ৭৪৮টি। ২০২৪ সালের তুলনায় ২৯৩টি দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি বাড়লেও সিলিন্ডার আমদানি, বাজারজাতকরণ ও মান এবং নিরাপত্তা পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের তদারকি সংস্থাগুলো নির্বিকার! ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে অগ্নিকা- ঘটে ২৭ হাজার ৫৯টি; প্রাণহানি হয়  ৮৫ জনের, আহত হন ২৬৭ জন। চুলা থেকে দুই হাজার ৯০৯টি (১০.৭৫%), গ্যাস সিলিন্ডার যন্ত্রাংশের লিকেজ থেকে ৯২০টি (৩.৪০%), গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজ থেকে ৫৬২টি (২.০৮%) এবং গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি (০.৪৫%) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সরকারি দপ্তরের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট বিপদের পারদ কতটা ঊর্ধ্বমুখী।

গ্যাস লিক হলে গন্ধ পাওয়া যাবে, যা এর পূর্ব লক্ষণ হিসেবে ধরে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, স্বাভাবিকভাবে এটা বলা হলেও; এও মনে রাখতে হবে, সব প্রাকৃতিক গ্যাসে গন্ধ থাকে না। এলপিজি গ্যাস সরবরাহকারীদের তদারকির আওতায় আনার পাশাপাশি গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি সারাতে গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ ও বাড়িওয়ালাদের দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সিলিন্ডারের মান নিয়ে প্রশ্নও নতুন নয়। আমরা মনে করি, সমগুরুত্বেই সেদিকেও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক যে পদ্ধতি উন্নত বিশ্বে বহু বছর ধরে চলে আসছে, তাও অনুসরণ করার তাগিদ আমরা দিই। গ্রাহক বা ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। নিয়ম মানতে হবে। রান্নাঘরের দরজা-জানালা খুলে রাখা বাঞ্ছনীয়, যাতে গ্যাস জমতে না পারে। জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণের প্রতিরোধের বিষয়গুলো সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় জোর দিতে হবে। গণমাধ্যম এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোকে থাকতে হবে সরব। তবে গ্যাস কর্র্তৃপক্ষ ও বাড়িওয়ালাদের গাফিলতির আইনানুগ ব্যবস্থার গুরুত্ব সর্বাধিক। দায় চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবিধানের ক্ষেত্রে যে নির্বিকারত্ব দৃশ্যমান তা মেনে নেওয়া যায় না।

আবাসিক এলাকায় গ্যাস বিস্ফোরণের ধারাবাহিকতা বন্ধ করতে কালক্ষেপণ না করে সরকারের তরফে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমরা মনে করি, জরুরি ভিত্তিতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার জরুরি। আবাসিক এলাকায় নিয়মিত গ্যাস ডিটেক্টর দিয়ে লিকেজ পরীক্ষা এবং অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি অবলম্বন করাও জরুরি। আর বাজারে

থাকা সব সিলিন্ডারের ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধে অনমনীয় অবস্থান নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনা জিইয়ে আছে, এর দায় সংশ্লিষ্ট কারোরই এড়ানোর অবকাশ নেই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত