বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রেলওয়ে স্টেশন হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলার জগতি রেলওয়ে স্টেশন। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা-কুষ্টিয়া রুটে যাতায়াতের জন্য ১৮৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেশনটি বর্তমানে ঐতিহ্য ও গুরুত্ব হারিয়ে প্রায় পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সেই সময় বাংলাদেশের মানুষ রেলগাড়িকে বলত ‘লোহার ঘোড়া’। মূলত ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি কলকাতা-রানাঘাট লাইনকে বর্ধিত করে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেললাইন শাখা উন্মোচন করলে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলার ভূখ-ে প্রথম রেলস্টেশন জগতি। এটি একসময় কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ছেড়ে বাস্তবে দেখার ইচ্ছা আমরা এক বিকেলে ছুটে যাই জগতি স্টেশনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব দ্বিতল বাসে চড়ে বিকেল ৩টায় রওনা দেই কুষ্টিয়া শহরের উদ্দেশে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থেকে কুষ্টিয়া শহর ২৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। দুই পাশে ফসলি জমির বুক চিরে চলে গিয়েছে মহাসড়ক। বাসের জানালার পাশে বসে চোখ জুড়ানো সবুজ প্রকৃতি বেশ উপভোগ্য ছিল। বড়জোড় এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা চলে আসি কুষ্টিয়া জেলার প্রাণকেন্দ্র মজমপুরে। মজমপুর নেমে আমরা অটো ভাড়া করি জগতি স্টেশনে যাওয়ার জন্য। পরে উপজেলা পরিষদের সড়ক ধরে যাত্রা করি স্টেশনের উদ্দেশে। প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা জগতি রেল বাজার এলাকায় চলে আসি। বলে রাখি, এখানে রয়েছে জগতির বিখ্যাত ১ টাকার পুরির দোকান। জগতি বাজার রেলগেটে এলেই ডানদিকে তাকালে চোখে পড়ে প্রায় দেড় শতবর্ষী প্রাচীন লাল ইটের রেলওয়ে ভবনকে। ব্রডগেজ লাইন ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই আমরা এসে পড়ি ইতিহাসের কাছে, জগতি স্টেশনে। কালপরিক্রমায় রেলওয়ে দালানটি বর্তমানে বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। টিনের চালাও মরিচা ধরে জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গেছে। স্টেশন ভবন সংলগ্ন রয়েছে দোতলা একটি অফিস ভবন। অফিসের ভুতুড়ে ভবনটিতে নেই কোনো কার্যক্রম। কিছুটা দূরে পশ্চিম দিকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের পানির চাহিদা মেটাতে তৈরি করা হয়েছিল একটি বিশালাকার পানির ট্যাংক, যা এখন পরিত্যক্ত। বিশাল বটগাছ পরিত্যক্ত স্থাপনাকে যেন পরম মমতায় আগলে রেখেছে। জগতি স্টেশন ভবন ও লাগোয়া অফিস ভবনে এখন ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষদের দেখতে পাওয়া যায়। আশপাশেও আছে কিছু পুরনো বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। যেগুলো এখন সাপখোপ আর নিশাচর প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। অনেক ট্রেন জগতি স্টেশন হয়ে গেলেও একটি লোকাল ট্রেন ছাড়া নেই কোনো স্টপেজ। স্টেশন প্ল্যাটফর্মের ইট ও মেঝের অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে এবং আগাছায় পরিপূর্ণ। কুষ্টিয়া শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকায় যাত্রী পাওয়া যায় না। এক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, স্টেশনের আশপাশের অনেক জমি স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। এ ছাড়া সীমিত ট্রেন সংযোগ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, জনবল সংকট ও নানা সুবিধার অভাবে প্রাচীন এই স্টেশনের কদর কমে গেছে। কিন্তু কদর কমলেও বিকেল হলে জগতি একটি ছোটখাটো পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নেয়, দূরদূরান্ত থেকেও লোকজন আসে দেখতে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও এখন স্টেশনের অবস্থা অনেক করুণ ও অবহেলিত। ট্রেনসংযোগ বাড়িয়ে ও আধুনিকায়ন করে পুনরায় জগতি স্টেশনের যৌবন ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। একসময় দেশের রেল যোগাযোগের গর্ব ছিল জগতি কিন্তু আজ তা শুধু একটি ভাঙাচোরা ঐতিহাসিক স্মৃতি।
লেখক : শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় সেমিস্টার, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া