টাকা ছাড়াই ৬৪ জেলা ঘুরে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার বার্তা ছড়ালেন জাহিদ

রাত গভীর। অচেনা এক জেলার ছোট্ট বাজার। দিনের ক্লান্তি শেষে এক কোণে বসে আছেন এক তরুণ। পকেটে টাকা নেই, সামনে অনিশ্চিত পথ—তবুও চোখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি জ্বলছে এক ধরনের তৃপ্তি। কারণ, সেদিনও কয়েকজন মানুষকে সে বুঝিয়ে এসেছে একটি শব্দ—“থ্যালাসেমিয়া”।

দেশ রূপান্তরের সাথে আলাপকালে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বলেছেন তার ভ্রমণের কথা। চট্টগ্রামের  তরুণ শেখ জাহিদ হাসান। ফটিকছড়ির হেয়াকো গ্রামের বেড়ে ওঠা। টানা ৬১ দিন ভ্রমণ করেছেন দেশের ৬৪ জেলা।কোনো আর্থিক সঞ্চয় নয়, বরং মানুষের সহমর্মিতা আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে। তার নিজের উপজেলায়ই প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ এই রোগের বাহক। সেখান থেকেই জন্ম নেয় সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ। সেই ইচ্ছে থেকেই গত বছরের ১ ডিসেম্বর বেরিয়ে পড়েন বাড়ি থেকে, উদ্দেশ্য পুরো দেশ ঘোরা এবং সচেতন করা। তার এই যাত্রা শুরু হয় গত বছরের ১ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি থেকে । ব্যাগে ছিল কিছু কাপড় আর হাতে ছিল একটাই লক্ষ্য—মানুষকে জানানো, থ্যালাসেমিয়া কী, কেন ভয়ংকর, আর কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব। এরপর এক জেলা থেকে আরেক জেলা,অজানা পথ, অচেনা মানুষ, কিন্তু একটাই পরিচয় “আমি থ্যালাসেমিয়ার  সচেতনতা ছড়াতে বের হয়েছি।”

জাহিদ বলেন, পথটা সহজ ছিল না। কখনো বাসের সিটে, কখনো ট্রাকের ছাদে চড়ে পাড়ি দিয়েছি দীর্ঘ পথ। রাত কাটিইয়েছি কখনো অচেনা হোটেলে, কখনো নতুন পরিচিত মানুষের ঘরে। অনেক সময় খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না, তবুও কেউ না কেউ এগিয়ে এসেছে।

কোনো এক দুপুরে এক রেস্তোরাঁ মালিক তার ভালো কাজের কথা শুনে বিনা মূল্যে খাবার দিয়েছেন। আবার কোথাও মাঠে কাজ করা কৃষক নিজের থালার ভাত ভাগ করে তুলে দিয়েছেন তার হাতে ! অচেনা মানুষের এই ছোট ছোট সহানুভূতিই হয়ে উঠেছে তার পথচলার বড় শক্তি।

জাহিদ বলেন,“আমি যখন আমার উদ্দেশ্যটা সবাইকে  বলতাম, তখন বেশিরভাগ মানুষই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন। তখন মনে হয়েছে মানুষ এখনো অনেক মানবিক।”

ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে তিনি কথা বলেছেন শত শত মানুষের সঙ্গে।সচেতন করেছেন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে, লিফলেট বিলি করেছেন, সহজ ভাষায় বুঝিয়েছেন থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি।

তিনি বলেন, “অনেকেই জানেই  না এই রোগ সম্পর্কে। তখন মনে হয়েছে এই কাজটা চালিয়ে যাওয়া খুব দরকার।” আর লিফলেট তৈরিসহ যেসব টুকটাক খরচ হয়েছে সেটিও এসেছে শুভাকাঙ্ক্ষীদের পকেট থেকে।'

মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা জাহিদ নয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। জীবনের বাস্তবতা তাকে টেনে নিচ্ছে দায়িত্বের দিকে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হয়তো একদিন বিদেশে পাড়ি জমাতে হবে। তবুও এই সময়টাকে তিনি অন্যভাবে দেখতে চান।

তিনি বলেন, “একদিন হয়তো আমার কাছে টাকা থাকবে, কিন্তু তখন সময় থাকবে না। এখন সময় আছে আমি সেটা মানুষের জন্য ব্যবহার করতে চাই,”।

চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শেষ হয় তার এই ব্যতিক্রমী যাত্রা। মাঝখানে ১০ দিনের বিরতি থাকলেও, মোট ৬১ দিনেই পূর্ণ করেন ৬৪ জেলার ভ্রমণ।

দেশজুড়ে মানুষের ভালোবাসা আর সহমর্মিতা কাছ থেকে দেখার পর জাহিদের স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি চান, থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার এই বার্তা নিয়ে একদিন দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছে যেতে বিশ্বজুড়ে।তিনি বলেন, আমার কারণে যদি ৬৪ জেলার অন্তত ৬৪ জন মানুষও উপকৃত হন, সেটিই হবে আমার সাফল্য।