বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ নিয়ে গ্রাহকের যে অভিযোগ, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ নেওয়া হচ্ছে। সেটি কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিটারের ব্যবহৃত প্রোগ্রাম কীভাবে কাজ করে, ভেতরে কী সেটিং আছে, সেগুলো বুঝতে পারলে ১০ শতাংশ চার্জ নিয়ে সমাধানে আসা সম্ভব হবে।
গতকাল রবিবার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার : জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং দৈনিক সমকাল যৌথভাবে আয়োজিত বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাবের গবেষণা সম্পাদক প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নানা সংকটের কথা তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা বর্তমানে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, উৎপাদন সক্ষমতা এর চেয়ে বেশি, ৩০ হাজার মেগাওয়াট। রিজার্ভ মার্জিন ধরে রাখতে প্রায় ২২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা হলেই চলে। ফলে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র অব্যবহৃত অবস্থায় থাকছে। কিন্তু এসব কেন্দ্রের সঙ্গে করা চুক্তির কারণে সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ খাত এখন সম্পূর্ণভাবে আমদানি করা জ্বালানি-কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় যাচ্ছে, যা ভোক্তাপর্যায়ে সমন্বয় করা কঠিন। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরকারের কাছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা পাবে, যা পরিশোধে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে। বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
দেশে জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও ভোক্তার অধিকার উপেক্ষিত হয়েছে বলে বৈঠকে অভিযোগ করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতাহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি লুণ্ঠনমূলক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বেড়েছে এবং ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়েছে।
তার অভিযোগ, নীতিনির্ধারণ ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, গণশুনানি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ভোক্তার স্বার্থের পরিপন্থী। এমনকি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
শামসুল আলম আরও বলেন, প্রিপেড মিটার প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই চুক্তি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, টেকসই সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি। সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালায় কাঠামোগত সংস্কার এনে প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হবে এবং জনগণের ওপর এর প্রভাব বাড়তেই থাকবে। তিনি মন্ত্রী-এমপিদের বাসার ছাদে সোলার স্থাপনের দাবি তোলেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকার ও সংসদের দায়িত্ব হলো খাতটিকে জ্বালানি রূপান্তরমুখী করা এবং এ লক্ষ্যে নীতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ আইন বাতিল, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়া চালুর মতো পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অবাস্তব উচ্চ চাহিদার লক্ষ্য নির্ধারণ অতীতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও উচ্চ ব্যয়ের চুক্তিকে উৎসাহিত করেছে। এতে করে ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, জ্বালানি খাতে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত বড় সমস্যা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতিতে ত্রুটি রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, গ্রিড কোম্পানি ও পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সৌরশক্তি, সোলার সেচ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। কিন্তু নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার কারণে এই খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি পাচ্ছে না।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জনগণের স্বার্থ অনুসারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত দেশবিরোধী চুক্তিগুলোর বিষয়ে বর্তমান সরকারকে ভেবেচিন্তে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হোসেন রুবেল বলেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট মূলত পরিকল্পিত আমদানিনির্ভর নীতির ফল, যেখানে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান অবহেলিত হয়েছে এবং বাপেক্সকে দুর্বল করা হয়েছে। কুইক রেন্টাল ও বিদেশি পরামর্শনির্ভর নীতির কারণে তেল এবং এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অস্বচ্ছ চুক্তি ও উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্পের কারণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হলেও তার বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মঞ্জুর মঈন বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। জ্বালানি খাতে মজুদদার ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব বেড়েছে, ফলে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো দুর্নীতিমুক্তি। সরকারের দায়িত্ব, জনগণের অর্থ সুরক্ষায় সিস্টেম লস কমানো এবং জ্বালানি ক্রয়-বিপণনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, ডেফোডিল ইউনিভার্সিটির ডিন অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান, ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া প্রমুখ।