জমিতেই নষ্ট হচ্ছে পেঁয়াজ

আমি সাত পাকি (২৪ শতাংশে ১ পাকি) জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলাম। আশা ছিল সাত পাকির পেঁয়াজ কমপক্ষে ৭ লাখ টাকা বিক্রি করব। এখন আমার সব পেঁয়াজ পানির নিচে। বেশির ভাগ পেঁয়াজ পচে গেছে। যেগুলো আছে, কোনোমতে তুলে বাজারে নিচ্ছি। কিন্তু বাজারে এই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে না। এই পেঁয়াজ আমি এখন কী করব। শ্রমিক নিয়ে যা তুলছি, তাতে শ্রমিকের টাকাই হচ্ছে না। বৃষ্টি আমার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে। কথাগুলো বলছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের কৃষক সঞ্জিত কুমার দাস।

শুধু সঞ্জিত কুমার দাস নন, তার মতো হাজারো কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে গত সপ্তাহে এক দিনের বৃষ্টিতে। পেঁয়াজ চাষ করা পরিবারগুলোতে এখন হতাশার চিহ্ন। অনেকেই ধারদেনা করে আবাদ করেছিলেন পেঁয়াজ। এখন সেই ধারের টাকা পরিশোধ করতে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে কপালে। ক্ষতি কমাতে সরকারের সহযোগিতা চান তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় ৩৪ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১১ হাজার ৬৩৭ হেক্টর জমিতে। পাংশা উপজেলায় ১০ হাজার ৬৬৭ হেক্টর, কালুখালী উপজেলায় ৮ হাজার ৬৪০ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৪২৯ হেক্টর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ২ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় চলতি বছরে ৬ হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও ১৪১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজবীজ (কদম) চাষ হয়েছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর জেলার পাঁচটি উপজেলায়ই শিলাবৃষ্টি হয়। তবে জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বেশি বৃষ্টি হয় সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায়। বৃষ্টিতে জেলার ১৩৮ হেক্টর জমির পেঁয়াজ পানির নিচে ডুবে যায়। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ হেক্টর জমির পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের চন্দনী দক্ষিণপাড়া মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ পেঁয়াজের জমিতে পানি জমে আছে। পানি জমে থাকায় পেঁয়াজ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কৃষক পানির মধ্য থেকেই পেঁয়াজ তুলছেন। কেউ কেউ পেঁয়াজ তুলে উঁচু জমিতে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। কিছু জমিতে এখনো এক ফুটের বেশি উচ্চতায় পানি জমে আছে। অনেক জমির পেঁয়াজ একেবারেই পচে গেছে। কয়েকজন নারী সেই জমি থেকে বেছে বেছে পেঁয়াজ তুলে নিচ্ছেন।

সঞ্জিত কুমার দাস বলেন, সাত পাকি জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করতে তার আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টি না হলে কমপক্ষে সাত লাখ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারতেন তিনি। এখন সব পেঁয়াজ পানির নিচে। পেঁয়াজ তোলার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মজুরি দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা করে। পানির মধ্য থেকে বাছাই করে পেঁয়াজ তুলতে হচ্ছে। এই পেঁয়াজ ঘরে সংরক্ষণ করার মতো অবস্থা নেই। বাজারে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। বাজারে এক মণ পেঁয়াজ ৫০০ টাকার বেশি কেউ দাম বলে না। বৃষ্টিতে তার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।

ভারতী রাণী নামে এক নারী দুজন শ্রমিক নিয়ে নিজের জমি থেকে পেঁয়াজ তুলছিলেন। তিনি বলেন, পাঁচ পাকি জমিতে তিনি হালি পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। এতে তার প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টির পর জমিতে এক হাত উচ্চতায় পানি জমেছিল। এখন পানি কিছুটা কমেছে। কিন্তু জমির বেশির ভাগ পেঁয়াজ পচে গেছে। যেগুলো ভালো আছে, সেগুলো তুলতে শ্রমিক পাওয়া যায় না। একজন শ্রমিককে দিনে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়েও কাজ করানো যাচ্ছে না। পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

সমিরন নামের এক নারী পেঁয়াজ তুলে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। জমির মালিকরা এই পেঁয়াজ তুলছেন না। তারা নাকি আর তুলবেন না। তাই আমি এসেছি তুলে নিতে। অল্প তুলেছি। বেশির ভাগই পচা। এর মধ্যে বেছে বেছে তুলে নিচ্ছি। আমরা গরিব মানুষ যে কয়টা পাই, তাতেই আমাদের একটু আয়েশ হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলার ১৩৮ হেক্টর পেঁয়াজের জমিতে পানি জমেছিল। ৫০ থেকে ৬০ হেক্টর জমির পেঁয়াজ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা কৃষককে এগুলো তুলে দ্রুত বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। বৃষ্টির বিষয়ে আমরা কৃষকদের আগাম বার্তা দিয়েছিলাম। এবার বৃষ্টিটা একটু আগাম হয়েছে। অন্য উপজেলার তুলনায় সদর উপজেলায় একটু ভারী বৃষ্টি হয়েছে। সদরের কিছু নিচু ধানি জমিতে এ বছর পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছিল। এ কারণে এক বৃষ্টিতেই সেসব জমিতে পানি জমে গেছে। আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।