সৌদিতে বাংলাদেশি নারীদের কষ্টের কথা কেউ শোনে না

সৌদি আরবের শ্রমবাজার বর্তমানে ওই দেশের নারীদের দখলে। অফিস, আদালত, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সর্বত্র তাদের অবাধ বিচরণ। ভোর থেকে শুরু করে সারা রাতই তারা কাজ করছেন, মোটা অঙ্কের বেতনও পাচ্ছেন। বিপরীতে সেখানে বাংলাদেশের নারীরা অনেক পিছিয়ে। তারা বিভিন্ন কোম্পানি বা দালালদের মাধ্যমে সৌদি আরব গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। অনেকেই কোম্পানি অথবা ফ্রি ভিসায় গিয়ে চাকরি করছেন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারীরা আরবি ও ইংরেজি ভাষা না পারায় সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। এমনকি কেউ কেউ ওই দেশে ‘অসামাজিক কাজে’ জড়াতেও বাধ্য হয়েছেন। এক হাত থেকে আরেক হতে বিক্রি করা হচ্ছে তাদের। প্রতিকার চেয়েও পাচ্ছেন না। তাদের কষ্টের কথা কেউ শোনে না। এমনকি ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে অভিযোগ দিলেও আমলে নিচ্ছে না সৌদি পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, এক দশকে সৌদি আরবের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশটির নারীদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ। একসময় ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকা সৌদি নারীরা আজ দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন। এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ‘ফ্রি ভিসা’ আর দালালদের খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। ২০০৮ সাল থেকে সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারী কর্মীদের প্রবেশ বন্ধ ছিল। সরকার নানা দেনদরবার করে কয়েক বছর পরই সৌদি আরবে শ্রমবাজার চালু করে। আর এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠাতে রাজি হয়। কিন্তু নারী শ্রমিকদের পাঠিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। সৌদি আরবের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ‘মিনি পতিতালয়’ গড়ে তুলেছে ওই দেশের নিয়োগপ্রাপ্ত বিভিন্ন কোম্পানি। নারী শ্রমিকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে। সম্প্রতি যারা দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের কারণে অনেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকেই। গত চার বছরে দুই লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পাঠানো হয় সৌদি আরবে।

সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, রিয়াদ, দাম্মাম, মক্কা ও মদিনাসহ কয়েকটি স্থানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। তার মধ্যে নারী শ্রমিকরা বেশি খারাপ অবস্থায় আছেন। বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজন শ্রমিকদের খোঁজ নিচ্ছেন না। কোম্পানির লোকজন বেশির ভাগ শ্রমিকের সঙ্গেই প্রতারণা করে আসছে। আর বাংলাদেশের দালালরা বেশি সক্রিয়। তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিভিন্ন কোম্পানির লোকজনের সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে এসব হয়রানি বেশি হচ্ছে।

প্রতিটি কর্মস্থলেই সৌদি নারীদের জয়জয়কার : সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণার পর থেকেই সৌদি আরবে আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। আগে যেসব কাজে শুধু বিদেশি শ্রমিক বা সৌদি পুরুষদের দেখা যেত, এখন সেখানে সৌদি নারীরা দাপটের সঙ্গে কাজ করছেন। কর্মস্থলে পুরুষের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে। একটি শপিং মলে কাজ করেন সৌদি নারী উম্মে কুলসুম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাধা উপেক্ষা করেই আমরা সবকিছু জয় করছি। দোকানে চাকরি করলেও ভালো বেতন পাচ্ছি। আমাদের দেশের মেয়েরা ব্যাংক, আইটি, খুচরা বিক্রয়কারী, বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি করছেন। সবারই শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো। আরবি ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতে পারদর্শী কেউ কেউ। মাসিক বেতন ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার রিয়ালে চাকরি হচ্ছে অনেকেরই।

তিনি আরও বলেন, সুপারশপ, শপিং মল, ব্যাংক এবং হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে এখন সৌদি নারীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক বললেই চলে। ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পে সৌদি নারীদের অংশগ্রহণ দেশটির জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা : সৌদি আরবের এই আধুনিকায়নের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের নারী কর্মীরা। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দক্ষতার অভাব এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতা। অন্যান্য দেশ যেমন ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ার নারী কর্মীরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দক্ষতা নিয়ে সৌদিতে যান। ফলে তারা উন্নতমানের সেবা দিতে পারেন। বিপরীতে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ নারী কর্মী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশটিতে পাড়ি জমান। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের চাহিদা বুঝতে না পারায় তারা ভালোমানের কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ফ্রি ভিসা ও বাসাবাড়ির কাজের মরীচিকা : বাংলাদেশি নারী কর্মীদের একটি বিশাল অংশ এখনো তথাকথিত ‘ফি -ভিসা’র মোহে সৌদি আরব যাচ্ছেন। অথচ সৌদি আইন অনুযায়ী ‘ফ্রি ভিসা’ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ফ্রি ভিসার নামে যাওয়া নারীরা মূলত কোনো নির্দিষ্ট স্পনসর ছাড়াই কাজ করার চেষ্টা করেন। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। যারা বৈধভাবেও গৃহকর্মী হিসেবে যাচ্ছেন, তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক সময় চুক্তির অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং বেতন না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। আবার আকামা (কাজের অনুমতিপত্র) না থাকা বা মেয়াদ না থাকার কারণে অনেক নারী পুলিশি অভিযানের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান, যা তাদের আরও নিরাপত্তাহীন করে তোলে।

দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত : সৌদি আরবে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অসাধু দালালের সিন্ডিকেট। গ্রামের সহজ-সরল নারীদের ‘উচ্চ বেতন’ আর ‘আরামের কাজে’র প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলের সহজ-সরল তরুণীদের ফুসলিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে নারীদের কেনাবেচা করছে। সৌদির কিছু স্থানীয়, বিদেশি ও বাংলাদেশি যুবকরা সমন্বয় করে তরুণীদের কেনাবেচা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এক ভুক্তভোগী নারী। প্রায় দুই মাস আগে তিনি নওগাঁ থেকে সৌদি আরবের রিয়াদে যান। যাওয়ার পরপরই তাকে একটি গ্রুপ বিক্রি করে দেয়। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পুলিশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য পেয়ে নড়েচড়ে বসে। ওই তরুণী জানিয়েছেন, রিয়াদসহ বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে নারী কেনাবেচা। সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে কফিলরা আসেন, দাম ঠিক করে নিয়ে যান পছন্দমতো। তাকেও বিক্রি করার চেষ্টা চলে। এ ধরনের অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করতে গিয়ে ক্যাম্পে এসেও মার খান তিনি। বাংলাদেশিদের সহায়তায় সৌদি ও অন্য দেশের কিছু নাগরিক বাংলাদেশের তরুণীদের নানা অনৈতিক কাজে বাধ্য করান। কেউ রাজি না হলে চলে নানা কায়দায় নির্যাতন।

তিনি আরও জানিয়েছেন, নিলামে তোলা হয় বাংলাদেশ থেকে আসা নারীদের। গৃহকর্মীর কথা বলে সবাইকে আনা হয়। অথচ দেওয়া হয় পতিতালয়ে। এমনও নারী আছেন, যারা ওইসব কাজে যাওয়ার পর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পারেন না। এভাবেই চলছে নারীদের জীবন। তার অভিযোগ, বাংলাদেশ দূতাবাস জেনেও না জানার ভান করছে। বাংলাদেশের দালালরা কারোরই খোঁজ নেন না। পল্টন এলাকায় একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি আছে। তাদের মাধ্যমে দালালরা নারীদের সৌদি আরবসহ অন্যান্য স্থানে পাঠান।

ভিটেমাটি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নারীরা বিদেশে : মানব পাচার নিয়ে কাজ করেন পুলিশের এমন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দালালরা আশ্বাস দেন সৌদিতে গেলেই সোনার হরিণ মিলবে; কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায় থাকার জায়গা নেই এবং কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভিটেমাটি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নারীরা বিদেশে যান। কাজ না পেয়ে বা নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে আসার সময় তারা আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েন। দালালের মাধ্যমে যাওয়ার পর তাদের কোনো সঠিক নথিপত্র থাকে না, ফলে বিপদে পড়লে দূতাবাসের সহায়তা পেতেও বেগ পেতে হয়।

তিনি আরও বলেন, বিদেশে পাঠানোর আগে গৃহকর্মীর বাইরে নার্সিং এবং হসপিটালিটি খাতে নারীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। আরবি এবং প্রাথমিক ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ফ্রি ভিসার কুফল সম্পর্কে গ্রামীণ পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

তার মতে, সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের ভূমিকা আরও জোরদার করলেই নারী শ্রমিকরা সৌদি বা অন্য কোনো দেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হবেন না।