দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে পড়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, অর্থনীতির খারাপ অবস্থা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবতায় ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অতিরিক্ত ব্যয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও রাজস্ব ভবনে এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মন্তব্য করেন। এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান ও আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কের সদস্যরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় মন্ত্রী জানান, রাজস্ব আদায়ে বড় কোম্পানিগুলোর কর ফাঁকি বন্ধে সরকার তৎপর হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ শিল্পগ্রুপগুলোর কর ফাঁকির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে তদন্তে নেমেছিল, তা আবার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল বেক্সিমকো, সামিট, এস আলমসহ বিভিন্ন শিল্পগ্রুপের কর ফাঁকির তদন্তে নামে। সে সময় কিছু কর আদায়ও করা হয়। সেই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সবকিছুই আলোচনা হয়েছে। এটা খালি একটা বিষয় নিয়ে না। এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে। সবকিছুই পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
নতুন সরকারের বাজেট তৈরি, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাবস্থার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনীতির খুবই খারাপ অবস্থায় আমরা দায়িত্বটা নিয়েছি। সে জায়গা থেকে প্রথমে আমাদের উদ্ধার পাওয়ার একটা বিষয় আছে। ইলেকশন মেনিফেস্টোতে (ইশতেহারে) যে কমিটমেন্টগুলো (প্রতিশ্রুতি) করেছি জনগণের কাছে, সেটাও বাস্তবায়ন করতে হবে। সুতরাং এখানে রিসোর্স মোবিলাইজেশন (সম্পদের সঠিক ব্যবহার) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমরা রিসোর্স মোবিলাইজেশন করতে না পারলে এগুলো সম্ভব না। একদিকে ইকোনমিকে স্যালভেজ (অর্থনীতি পুনরুদ্ধার) করতে হবে, অন্যদিকে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। তার ওপর এখন আরও বড় সমস্যা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। আমাদের বড় একটা অংশ এখানে (যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায়) খরচ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত দামে আমাদের জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। সুতরাং এটা থ্রি-ওয়ে চ্যালেঞ্জ (ত্রিমুখী বাধা)। এসব নিয়ে এনবিআরের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
চলতি বছর এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে সরকারের ভাবনা জানতে চাইলে আমির খসরু বলেন, ‘ওই অগ্রগতি তো... ওইটা এখন ইকোসকে (জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ) যাবে, ওখান থেকে পাস হয়ে যাবে জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে। আমরা দেখি কী হয়, এটা চলমান প্রক্রিয়া। যতক্ষণ কিছু না হয় ততক্ষণ একেবারে নিশ্চিতভাবে তো কিছু বলা যায় না।’
এ সময় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতির দিকে যাওয়ার কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা ছাপাতে চাচ্ছি না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যাতে আকৃষ্ট হয় এবং তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান যাতে সৃষ্টি হয়, সেটা মাথায় রেখে বাজেটটা করতে হবে। যাতে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হয় কি, আমরা কোনো কিছু লং টার্মে (দীর্ঘ মেয়াদে) রাখতে পারি না।
বর্তমানে দেশে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত পোশাক শিল্প। এই খাতের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে ঋণনির্ভরতা থেকে বের করে বিনিয়োগনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গার্মেন্টস খাতের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে, যেন রপ্তানি বহুমুখীকরণ সম্ভব হয়। শুধু গার্মেন্টস খাতের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, সরকার আগামী বাজেটকে সামনে রেখে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে টাকা ছাপিয়ে নয়, বরং বিনিয়োগ বাড়িয়েই অর্থনীতি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে বাজেটের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এতদিন উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল, তাদের প্রাপ্য নিশ্চিত করতে হবে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করেই বাজেট পরিকল্পনা করা হবে।’