ইউরিয়া সার নিজস্ব কারখানায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ঠিক রাখার পুরো দায়িত্ব বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাঁধে। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় কারখানা বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আমদানিই গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে লাভের সুযোগ থাকলেও বছরের পর বছর লোকসান গুনছে সংস্থাটি। এই অবস্থার উত্তরণে প্রতিষ্ঠানটি হাতে নিয়েছে নতুন পরিকল্পনা। শুধু সার কারখানাই নয়, বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানটির আরো কয়েকটি কারখানা চালু করা, নতুন শিল্পকারখানা তৈরি এবং বিদ্যমান কারখানার পতিত জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণসহ ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান।
ফজলুর রহমান বলেন, একসময় বিসিআইসি ছিল একটা রমরমা প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রচুর জনবল এবং অনেক কারখানা ছিল। আমি দায়িত্বে এসে দেখলাম প্রায় সব কারখানাই বন্ধ, কেবল ঘোড়াশাল-পলাশ ছাড়া। এর কারণ অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করি এবং সবগুলো সার কারখানাকেই উৎপাদনে ফেরাই। কিন্তু সেটাও আবার ইরান যুদ্ধের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়Ñ যা ছিল কষ্টের কারণ। এই জটিল সময়ে কারখানাগুলো চালু থাকলে ইউরিয়া নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। এর মধ্যে সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি এবং ঘোড়াশাল চালুর পর্যায়ে এনেছিÑ যা দ্রুতই উৎপাদনে ফিরবে এবং আগামী মে মাসে কাফকো এবং শাহজালাল চালু হবে।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান জানান, শুধু সার কারখানাই নয়, বিসিআইসির অন্যান্য বন্ধ কারখানাগুলোও চালুর জন্য ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। কারণ বিসিআইসি সে সময় প্রতি বছর লোকসানে ছিল এবং মূলত ডিভিডেন্ডের ওপর চলছিল। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ, মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট এবং বিসিআইসির প্রাক্তন কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা করে সংস্থাটিেেক লাভজনক করতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
সেখান থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা যেমন উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি, চিটাগাং কেমিক্যালস, ঢাকা লেদার কোম্পানি, কর্ণফুলী পেপার মিল, খুলান বোর্ড মিলসসহ বিভিন্ন কারখানা সংস্কার করে নতুন করে চালুর বিষয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে বলে জানান বিসিআইসির চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে বিসিআইসির খালি থাকা জায়গাগুলোতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের।
এছাড়া ভোলায় নতুন ইউরিয়া সারকারখানা, ঘোড়াশালে ইউরিয়া ফরমালডিহাইডের কারখানা, নতুন টিএসপি কমপ্লেক্স, খুলনায় স্টার্চ ফ্যাক্টরি, কেমিক্যাল কারখানা, পরিবেশবান্ধব ব্যাগ উৎপাদন কারখানা স্থাপনসহ প্রায় ১০ থেকে ১২টি নতুন প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। নেওয়া হয়েছে আগামী কয়েক বছরে ব্যাপক বিনিয়োগ পরিকল্পনা। এগুলোর কোনো কোনোটার ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবনাও তৈরি হয়েছে যেগুলো পর্যালোচনা ও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকিগুলোর দ্রুত কাজ শুরু হবে বলে জানান বিসিআইসি চেয়ারম্যান।
শুধু দেশেই নয়, যৌথভাবে বিদেশে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা নতুন করে চালু করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনায় সৌদি আরবে বিসিআইসি যৌথ বিনিয়োগে একটি ইউরিয়া সারকারখানা তৈরির কাজ শুরু করেছে। সে অনুযায়ী, দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। এখানে আনুমানিক ৩০০ একর জমির ওপর একটি কারখানা স্থাপন করা হবে। যেখানে বছরে সাড়ে ১১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন হবে। দেশের গ্যাস-সংকটে যাতে সারের উৎপাদনে কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্যই এই পরিকল্পনা। যাতে দুই দেশের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। চূড়ান্ত অনুমোদনের চার বছরের মধ্যেই কারখানাটি তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানান বিসিআইসির চেয়ারম্যান। ফজলুর রহমান বলেন, বিসিআইসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং দেশের অর্থনীতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থবহ করে তুলতেই এসব কর্মযজ্ঞ। এজন্য বন্ধ কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ধাপে ধাপে বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।