কোভিডকালে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় দেশের একটি প্রজন্মে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা সবাই অবগত। কয়েক বছরে সেই চাপ যখন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা হচ্ছে, তখন আবার সামনে এসেছে অনলাইন ক্লাস। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশে জ¦ালানি তেলের সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে অনলাইন-অফলাইনের মিশেল শ্রেণি কার্যক্রম চালুর কথা ভাবছে সরকার।
এদিকে অনলাইন ও অফলাইন (সশরীরে) ব্লেন্ডেড পদ্ধতিকে অনেকে আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমও বলেছেন। তবে এই অনলাইন ক্লাস চালু নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবেরই প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইন-অফলাইন (সশরীরে) যা ব্লেন্ডেড পদ্ধতি বলে পরিচিত, সেই পদ্ধতিতে শ্রেণি কার্যক্রম চালাতে যাচ্ছে সরকার। এই পদ্ধতিতে ছয় দিনের মধ্যে তিন দিন অনলাইনে ও তিন দিন অফলাইনে ক্লাস নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক দিন অনলাইনে হলে পরের দিন সশরীরে ক্লাস হবে। এতে সপ্তাহে ছয় দিনই ক্লাস হবে। কিন্তু শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা এই পদ্ধতির পক্ষে নয়। তাদের মতে, এতে দেশের মেরুদন্ড বলে খ্যাত শিক্ষা খাত ধ্বংস হবে। কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। ওই সময়ে শিক্ষার্থীরা এক শ্রেণি থেকে অপর শ্রেণিতে অটোপাস পেয়েছিল এমনকি পাবলিক পরীক্ষায়ও (২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা) অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এসএসসি ও এইচএসসি পাবলিক পরীক্ষায় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে, ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা শুধুমাত্র গুটিকয়েক বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছিল ৫০ নম্বরের, বাকি বিষয়গুলো সাবজেক্ট ম্যাপিং করে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। অনলাইন ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে অনেক কিছু বুঝতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রেই তারা পিছিয়ে গিয়েছিল। তাই আবারও অনলাইন ক্লাস চালু করা হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদন্ড পুরোপুরি ভেঙে যাবে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস বিষয়ে কথা হয় এই প্রতিষ্ঠানের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূর-ই-আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় এই অনলাইন ক্লাস চালু করা মোটেই কাম্য নয়। এতে শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রযুুক্তিগত বৈষম্য তৈরি হবে। যাদের কাছে অনলাইনের ডিভাইস থাকবে, তারা এগিয়ে থাকবে এবং যাদের কাছে নেই তারা পিছিয়ে পড়বে।’
এখনই অনলাইন নয়!:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু রাখলে বেশি জ্বালানি খরচ হবে, এই কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন চালু করার কোনো যৌক্তিকতা হতে পারে না উল্লেখ করে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূর-ই-আলম সিদ্দিকী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকা তৈরি না করে প্রয়োজনে অফিস-আদালতের টাইম এগিয়ে আনা যায়, শপিংমল ও মার্কেটগুলো রাতে বন্ধের সময় এগিয়ে আনা যায় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস টাইম সকাল (প্রাতঃবিভাগ) থেকে শুরু করা যায়।
তিনি আরও বলেন, সকাল সকাল ক্লাস শুরু হলে শিক্ষার্থীরা যেমন ভোরে ভোরে ঘুম থেকে উঠবে এবং তেমনিভাবে দুপুরের আগেই বাসায় গিয়ে রেস্ট নিয়ে বিকেলে খেলাধুলা করার সময় পাবে।
এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করা ড. শামসুদ্দীন শিশির। বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কর্মরত এই শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে এমনিতেই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি কম। করোনার পর থেকে কমে যাওয়া এই উপস্থিতির হার বাড়ানো যাচ্ছে না। এখন আবারও অনলাইন ও অফলাইনের মিশেল সিস্টেম চালু করা হলে শিক্ষাব্যবস্থায় শেষ সর্বনাশটা হবে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে না এলেও কিন্তু কোচিং সেন্টারগুলোর রমরমা বাণিজ্য ঠিকই চালু থাকবে।
কোভিডের সময়ে মানুষের জীবনের ঝুঁকি থাকার কারণে বৈশি^কভাবে অনলাইন পদ্ধতি চালু হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর মুস্তফা কামরুল আখতার। তিনি বলেন, বৈশি^ক জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে আমরা সাশ্রয়ী হতে পারি। তবে সেজন্য জাতির মেরুদন্ড বলে খ্যাত শিক্ষা খাতে এখনই অনলাইন চালু না করাই শ্রেয়। কারণ, কোভিডের নেতিবাচক প্রভাব আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনে সকালের শিফট চালুর মাধ্যমে স্বাভাবিক রাখা যেতে পারে।
আরও বিকল্প ভাবা যেতে পারে:
বর্তমান পরিস্থিতিতে এক দিন পর পর সশরীরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে ক্লাস করা ভালো সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে সরকারি আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এটা ঠিক কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়, যদিও তখন অনলাইন ক্লাসের কোনো বিকল্প ছিল না। এখনো জ্বালানি সংকট একটি বৈশি^ক সমস্যা। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে পারলে খুবই ভালো। যদি তা না করা যায়, তাহলে বিকল্প কী হতে পারে, তা নিয়ে আরও ভাবার সুযোগ রয়েছে।’
একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রামের ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের রেক্টর লে. কর্নেল (অব.) মঈনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘স্কুলের ছেলেমেয়েরা অনলাইন ক্লাসে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবে না। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে যাতে মেধার গ্রেডেশন গ্যাপ (পূর্ববর্তী সেশনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বর্তমান সেশনের শিক্ষার্থী) না হয়, সেজন্য সরকারের বিশেষজ্ঞরা ভেবেচিন্তে নিশ্চই যুগোপযোগী সিদ্বান্ত নেবেন।
চালু করা যেতে পারে স্কুলবাস সার্ভিস:
সরকারি আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যদি স্কুলবাস সার্ভিস চালু করা যেত, তাহলে হয়তো অনেক বেশি জ্বালানি সাশ্রয় হতো। শিক্ষার্থীপ্রতি প্রাইভেট কার আসত না, একটি বাসেই প্রায় ৪০টি প্রাইভেট কারের শিক্ষার্র্থী আসা-যাওয়া করতে পারত। শিক্ষার্থীরা একটি নির্ধারিত স্টপেজ থেকে উঠত।
একই মন্তব্য করেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. শামসুদ্দীন শিশির। তিনি বলেন, স্কুল বাস সার্ভিস দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও এর সুবিধা সবসময় থাকবে। এতে সড়কে যানজটও কমে আসবে।
ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা নায়েম:
ব্লেন্ডেড পদ্ধতিকে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মন্তব্য করেন জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোভিডকালে আমি রাজশাহী কলেজে ক্লাস করার সময় সফলভাবে নিয়েছি এবং শিক্ষার্থীরও তা ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। তাই বর্তমানে অনলাইন ও সশরীরের এই ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে একটি আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি এবং পর্যায়ক্রমে আগামীতে আমাদের এই পদ্ধতিতে যেতে হবে।’
কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা অনলাইন পদ্ধতিতে অনুধাবন করতে পারবে কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশে এখনো কোনো সংকট দেখা না গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং করে কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রেও অনলাইন অফলাইনের মিশেল শ্রেণি কার্যক্রম চালুর কথা ভাবছে সরকার।