ধানের দাম ঘোষণায় ঘাপলা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

প্রতি বছর সরকার যে সময়ে ধানের দাম ঘোষণা করে এবং ধান কেনা শুরু করে, তখন বেশিরভাগ ক্ষুদ্র কৃষকের ঘরে ধান থাকে না। এগুলো চলে যায় স্থানীয় ফড়িয়া, মজুদদার ও পাইকারদের কাছে। ফলে এ সময় স্থানীয় বাজারে দামটা সেভাবে বাড়ে না এবং কৃষকও এর খুব বেশি সুফল পায় না। পরে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করে সুবিধাভোগী হন মধ্যবর্তী ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা।

কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এপ্রিলের ২২ তারিখ সরকারিভাবে বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য এবং ১৮ লাখ মেট্রিক টন ধান ও চাল কেনার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এফপিএমসির একটি সভায় এই পরিকল্পনা অনুমোদনের পরই প্রতি বছর এটা ঘোষণা করে সরকার। ৩ মে থেকে ধান সংগ্রহ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অবশ্য বিগত সময়ের চিত্রে দেখা গেছে, যেদিন থেকে ধান কেনার ঘোষণা দেওয়া হয়, তারও প্রায় ১৫-২০ দিন পর থেকে পুরোদমে ধান কেনার জন্য প্রস্তুত হয় খাদ্য অধিদপ্তর। জানা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রায় সোয়া দুই কোটি টন চালের উৎপাদন হয়, যা দেশের সারা বছরের খাদ্যনিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে। এই উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশই আসে হাওর অঞ্চল থেকে। হাওরে চাষ করা হয় আগাম ধান। এপ্রিলের ৭ তারিখের মধ্যে সেই ধান কাটা শুরু হয় এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় শেষ হয়ে যায়। এবার অবশ্য ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত হাওরের বেশকিছু স্থানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে।

হাওরে যারা ধান চাষ করেন, তাদের বেশিরভাগই দরিদ্র কৃষক। ঋণ করে, দাদন নিয়ে অনেকেই ধান চাষ করেন। কাটার পরপরই বেশিরভাগ ধান বিক্রি করে দেন কৃষক। সেই হিসেবে হাওরের বেশিরভাগ কৃষকই সরকারের ঘরে ধান বিক্রির সুবিধা নিতে পারেন না।

কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারে হাওরে ধান কাটার পর থেকে স্থানীয় বাজারগুলোতে ৬৫০ থেকে ৯৫০ টাকা মণ হিসেবে ধান বিক্রি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর (২৫-২৬ এপ্রিলের পর থেকে) এই ধানের দাম নেমেছিল ৫শ থেকে ৬শ টাকায় এবং মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ৯৫০ টাকার বেশি দরে ধান বিক্রি করতে পারেনি কৃষক। অর্থাৎ সরকারের ঘোষিত দাম হাওরের ধানের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

পরবর্তী সময় অবশ্য সারা দেশের ধান উঠতে থাকায় মে মাসের শেষভাগে গিয়ে স্থানীয় বাজারগুলোতে দাম বাড়তে শুরু করে, যখন সরকার ধান কেনা শুরু করে এবং বাজারগুলোতে মান অনুযায়ী ১১শ টাকা মণ পর্যন্ত বিক্রি হতে থাকে। অথচ প্রতি মণ ধান সরকার কেনার ঘোষণা দিয়েছে ১ হাজার ৪৪০ টাকায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের কোষাগারে কৃষকরা ধান দিতে যান না বলেই বাজারে সরকার ঘোষিত দামের সমান দাম ওঠে না। অথচ সরকার কৃষকদের প্রণোদনামূলক মূল্য প্রদান করে ধানের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতেই ধান সংগ্রহ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। পাশাপাশি এটি জরুরি পরিস্থিতির জন্য নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে, সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় স্থিতিশীল সরবরাহ বজায় রাখতে, বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে সহায়তা করে।

গবেষক ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতের খরিপ মৌসুমের প্রস্তুতি শুরু হয় এপ্রিল থেকে মে মাসে। এ সময়েই কেন্দ্রীয় সরকার মৌসুমের ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (যে দামে সরকার ধান কিনবে) ঘোষণা করে দেয়। আর ধান কাটা শুরু হলে সেই দামে অক্টোবর বা নভেম্বরে কেনা শুরু করে রাজ্য সরকার।  

এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা চাষাবাদের শুরুতেই তার ধানের দাম কত হবে, সে বিষয়ে জেনে যান। পদ্ধতিগত জটিলতা না থাকায় ধান কাটার পর  সেই কৃষক নিশ্চিন্তে থাকেন। বাজারে কত দামে ধান বিক্রি করবেন তা তিনি আগেই জানেন। বাজারে কোনো কারণে ধানের দাম কম থাকলে কৃষক সহজেই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন না কৃষক।

তিনি বলেন, ‘আমাদের হাওরের অনেক কৃষক ধান বিক্রির পরে জানতে পারেন, তার উৎপাদিত ধানের সরকারি মূল্য কত। নতুন ধান বাজারে আসার সময় তার কাছে ভিত্তি মূল্যটা জানা থাকে না, তিনি দাম চাইতে পারেন না। আর সরকারের কেনাকাটায় খুব বেশি কৃষকের অংশগ্রহণ না থাকায় স্থানীয় পাইকার বা ফড়িয়ারা নিজেদের মতো করে একটা দাম ঠিক করেন এবং কৃষকের ধান কিনে নেন। অনেক ফড়িয়া ব্যবসায়ী আবার কৃষকের ক্ষেত থেকেই ধান কিনে নেন। ফলে কৃষকের বাজারদর যাচাইয়ের সুযোগ কমে যায়। ফলে আমাদের কৃষক ঠকেই যাচ্ছেন।

খাদ্য অধিদপ্তর চলতি বোরো মৌসুমে ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান কেনার সময়সীমা থাকলেও ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৫ হাজার মে টনের বেশি ধান কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এবার সরকার ৩৬ টাকা কেজি বা ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনছে, যার সুবিধাভোগী হওয়ার কথা কৃষকের। কিন্তু কৃষকরা মূলত বেসরকারি বাজারের ওপর নির্ভর করে ধান বিক্রি করেন।

জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর বোরো মৌসুমে সোয়া ২ কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়। গবেষণা বলছে, এর মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত ধান কেনা হয়। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের সক্ষমতা ঘাটতির দোহায় দিয়ে বরাবরই ধানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণে কেনা হয় চাল।

নীতিমালা অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সরকার সর্বনিম্ন ৩ মণ থেকে সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণে ধান কিনতে পারে। তবে কৃষকের সক্ষমতা অনুযায়ী ১ থেকে ৩ টন পর্যন্ত ধান বিক্রির কোটা দেওয়া হয়েছে একেকজন কৃষককে। 

জানা গেছে, প্রতিটি উপজেলায় ইউএনওর সভাপতিত্বে একটি কমিটি থাকে। এই কমিটিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সভাপতি কর্তৃক মনোনীত আরও দুই কর্মকর্তা, উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি, কৃষক প্রতিনিধি এবং উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকও থাকেন। ধান কেনার ঘোষণা দেওয়া হলে উপজেলা কৃষি অফিসে কৃষকদের কৃষি কার্ড এবং ভোটার আইডি জমা দিতে হয়। পরে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়, যারা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেন। ধান কেনাবেচার পরবর্তী সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন সংশ্লিষ্ট খাদ্য গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। কোনো কোনো উপজেলায় আবার লটারিও হয় না।

ধান কেনায় স্বচ্ছতা আনতে ২০১৯ সালে ‘কৃষকের অ্যাপ’ নামে একটি অনলাইন নিবন্ধন মাধ্যম চালু করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। কিন্তু এটি কৃষকের ব্যবহার-উপযোগী না হওয়ায় এখন বন্ধ বললেই চলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশের দুই কোটিরও বেশি কৃষক ধান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। তবে সরকারি নানা জটিলতার কারণে কৃষক নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারেন না, বেশিরভাগই দিতেই যান না। এভাবেই যারা দিনের পর দিন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের ২০ কোটি মানুষের খাবার জোগান দিয়ে যাচ্ছেন, তারাই ঠকছেন সবদিক থেকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত