জনবল সংকটে পড়ে আছে ৭ স্বাস্থ্যকেন্দ্র

সুসজ্জিত আধুনিক ভবন, অপারেশন থিয়েটার, শয্যা সবই প্রস্তুত। কিন্তু দরজায় তালা ঝুলছে বছরের পর বছর। জনবল না থাকায় পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় নির্মিত ১০ শয্যার ৭টি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এখনো চালু হয়নি। ফলে সরকারের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অলস পড়ে থাকার পাশাপাশি তৃণমূলের মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের দোরগোড়ায় মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রায় ৩২ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলার চারটি উপজেলায় ৭টি ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ করে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নির্মাণ শেষে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় শয্যা, সিজারিয়ান অপারেশনের যন্ত্রপাতিসহ নানা চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু জনবল না থাকায় এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। কার্যক্রম চালু না হওয়ায় সেসব যন্ত্রপাতি তালাবদ্ধ কক্ষে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানায়, ২০১৮ সালে চারটি, ২০২১ সালে একটি এবং ২০২২ সালে আরও দুটি কেন্দ্র পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলো হচ্ছে, পটুয়াখালী সদর উপজেলার ভায়লা, বাউফল উপজেলার কায়না, সাবুপুরা ও রাজাপুর, গলাচিপা উপজেলার সদর ইউনিয়ন ও পানপট্টি এবং মির্জাগঞ্জ উপজেলার দেউলি এলাকায়।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে দুজন মেডিকেল অফিসারসহ একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ও সহায়ক স্টাফ থাকার কথা। কিন্তু জনবল বরাদ্দ না থাকায় সেবা কার্যক্রম শুরুই করা যাচ্ছে না।

গত রবিবার সকালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার ভুরিয়া ইউনিয়নের ভায়লা গ্রামে অবস্থিত কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে দেখা যায়, আধুনিক তিনতলা ভবন প্রস্তুত থাকলেও সেখানে চিকিৎসাসেবা নেই। ভবনের পাশেই চিকিৎসক ও স্টাফদের জন্য আবাসিক সুবিধাসহ আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে । এই কেন্দ্রটির নাম দেওয়া হয়েছে কালু মোল্লা ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। ২০১৮ সালে কেন্দ্রটি ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করে এবং ২০২২ সালে কাজ শেষ করে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখনো এর কার্যক্রম শুরু হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা শাওন মোল্লা বলেন, ‘আমাদের গ্রামের মানুষ যাতে সহজে চিকিৎসা পায় সেই চিন্তা থেকেই আমার চাচা নিজের দাদার নামে জমি দান করে এই কেন্দ্রটি নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। ভবন নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২২ সালে হস্তান্তর করা হলেও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। ফলে অসুস্থ হলে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে পটুয়াখালী শহরে যেতে হচ্ছে।’

কেন্দ্রটির সামনে অবস্থিত জামে মসজিদের ইমাম মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘এত সুন্দর একটি ভবন খালি পড়ে আছে, এটা দুঃখজনক। সরকার জনগণের চিকিৎসার জন্য এটি করেছে, কিন্তু মানুষ সেবা পাচ্ছে না। এটি দ্রুত চালু করা দরকার বলে মনে করছি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা রুনা আক্তার জানান, তাদের পুরনো কেন্দ্রের ভবনটি জরাজীর্ণ হওয়ায় মাঝেমধ্যে তিনি এখানে বসে রোগী দেখেন। তিনি বলেন, ‘এটি চালু হলে আশপাশের মানুষের চিকিৎসা পাওয়া সহজ হবে এবং উপজেলা ও জেলা হাসপাতালের ওপর চাপও কমবে।’

এদিকে গলাচিপার পানপট্টিতে ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ায় ভেতরের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ঝুঁকিতে রয়েছে। এখনো এখানে কোনো লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের মতে, জেলার ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি চালু হলে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত খুলবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশেষ করে মা ও শিশুরা সহজেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে।

এ বিষয়ে পটুয়াখালীর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর অনেক আগেই এসব কেন্দ্র আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। কিন্তু জনবল বরাদ্দ না থাকায় এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমরা নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি।’