এলপিজির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি

১২ কেজিতে একলাফে বাড়ল ৩৮৭ টাকা

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা, ভোগান্তি আর অস্বস্তির মধ্যে এবার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম কেজিতে বেড়েছে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। বেসরকারি খাতের ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এপ্রিলে হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা। সাম্প্রতিককালে মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ল রান্নার কাজে জনপ্রিয় এই গ্যাসের দাম ।

অবশ্য এলপিজির দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন দেওয়া হলেও অন্তত চার মাস আগে থেকেই খুচরা বাজারে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে ভোক্তাদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন দাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। বিইআরসি অবশ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং জাহাজে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণেই সিলিন্ডার গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

তবে গণশুনানি ছাড়াই এলপিজির দাম বৃদ্ধিকে বিইআরসির স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবেই দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তার মতে, যুদ্ধ কিংবা বৈশ্বিক যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতির কারণে আমদানি পণ্যের দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু কতটুকু বাড়বে বা কমবে সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। গণশুনানি পরিহার করে তারা নিজে নিজে ঘরে বসে দাম নির্ধারণ করছে। ব্যবসায়ীরা এর আগেও তাদের নিজেদের মতো করে দাম বাড়িয়ে নিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যার ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়তই বাড়ছে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে, এমন শঙ্কা আগে থেকেই করছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

এখনো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা না হলেও পেট্রোলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনসহ এ নিয়ে নানা অস্থিরতা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে আগে দাম বাড়ল প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর এলপিজির। গতকাল বৃহস্পতিবার এলপিজির দাম কেজিপ্রতি ৩২ দশমিক ২৫ টাকা বাড়িয়ে মূল্য সমন্বয়ের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ভোক্তা পর্যায়ে এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজি ১৪০ দশমিক ২৯ টাকায় বিক্রি হবে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিইআরসির সবশেষ ঘোষণায় যা ১০৮ দশমিক ০৪ টাকা ছিল।

অর্থাৎ খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বেড়ে এখন থেকে ১ হাজার ৭২৮ টাকায় বিক্রি হবে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আমিরুল হক জানান, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক মূল্য বা সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস এপ্রিলের শুরুতেই গত মাসের তুলনায় চার শতাংশের মতো বেড়েছে।

সব পক্ষের অংশগ্রহণে গণশুনানি না করে দাম নির্ধারণের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না বলেই মনে করেন তিনি। এই বিশেষজ্ঞ অভিযোগ করেন, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের আগে গণশুনানি না করায় ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার আইনি দায়িত্ব পালন করছে না বিইআরসি। যার ফলে এই খাতে লুটপাটের যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে সেটিকেই মজবুত করছে।

এর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। এর পর এলপিজির আমদানি শুল্ক কমানোর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি দাম সমন্বয় করে ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা করা হয়।

বিইআরসি বলছে, বাজারে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এখন থেকে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে।

সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন এলপিজি বিক্রেতারা।

সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা এলপিজির সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে দাম ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।