আওয়ামী লিগ সরকারের পতনের পরও ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কে এতটা ভাটা পড়েনি, যতটা তিক্ততা বাড়িয়েছে সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। শেখ হাসিনা যখন ঢাকা থেকে পালিয়ে দিল্লিতে গোপন সরকারি আশ্রয়স্থলে, তখনো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দিল্লিতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে ভারতের বিপক্ষে। মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া এবং পাকিস্তানের ‘কাইট-ডিপ্লোমেসি’র অংশীদার হওয়াটা বিসিবি ও বিসিসিআই-এর সম্পর্কে বিভেদটা আরও স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের সরকারের মধ্যে জমে থাকা বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে, সেই উষ্ণতা হয়তো নৈকট্য ফেরাবে ক্রিকেটেও।
২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সফরে এসে ৩টা করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার কথা ছিল ভারতীয় দলের। তবে সে বছরই ৫ জুলাই বিসিসিআই-এর তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘ভয় বোর্ডের মধ্যে আলোচনার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ততা এবং দুই দলের সূচির সুবিধার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই বহুল প্রতীক্ষিত সিরিজের জন্য ভারতকে স্বাগত জানাতে বিসিবি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছে। এই সফরের সংশোধিত তারিখ এবং সূচি যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে’। ২০২৬ সালের প্রথম ৩ মাস পেরিয়ে গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ড তাদের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা খেলোয়াড় তালিকা ও আসন্ন ১ বছরের সফরসূচি চূড়ান্ত করে জানিয়েও দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে ভারতের তরফ থেকে এখনো কোনো সবুজ সংকেত পাওয়া যায়নি।
বিসিসিআই-এর ওয়েবসাইটে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় দল যতগুলো ম্যাচ খেলবে তার সবগুলোর তারিখ এবং সময়সূচি দেওয়া আছে। ৩১ মে পর্যন্ত তো আইপিএলই চলবে, জুনের ৬-১০; আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে একটা টেস্ট আছে ভারতের, ১৪, ১৭, ২০ তারিখে আছে ওয়ানডে। সেসব কোন স্টেডিয়ামে হবে এবং ক’টায় ম্যাচ শুরু হবে সব ঠিকঠাক দেওয়া আছে ওয়েবসাইটে। সেই সূচিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেপ্টেম্বরে ৬টা ম্যাচ নেই, তবে সেই সময়টায় অন্য কিছুও নেই। অথচ ঐ সময়ের আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারেতে ৩ টি-টোয়েন্টির সিরিজের খেলা শুরুর সময়টা পর্যন্ত চূড়ান্ত করা। সেপ্টেম্বরের শেষে ভারতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে, সে সবেরও দিনক্ষণ স্থানকাল সবই চূড়ান্ত। ফাঁকা কেবল বাংলাদেশ অংশটুকু। পিছিয়ে যাওয়া সিরিজটা শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়াবে নাকি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে, যেমনটা আয়ারল্যান্ড এই বছর বাংলাদেশকে আতিথ্য দিতে না পারার কথা জানিয়ে দিয়েছে; তার উত্তরটা নির্ভর করছে ভারত-বাংলাদেশ রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর।
‘ভারতের সঙ্গে আমাদের একটি সিরিজ নির্ধারিত আছে এবং আমরা নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছি’ জানিয়েছেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন ফাহিম। অন্যদিকে ভারতের ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আইপিএল চেয়ারম্যান অরুন ধুমাল বলেছেন, ‘আমি কেবল এটাই বলব যে যা ঘটেছে তা দুর্ভাগ্যজনক। এর বাইরে আমার বিস্তারিত জানা নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি সুবুদ্ধির উদয় হবে এবং ভবিষ্যতে এমনটা আর ঘটবে না’।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে বরফ গলতে শুরু করেছে। দুই তরফের সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তা ও রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে প্রাথমিক উত্তরণের সুর স্পষ্ট। একজন বিসিবি কর্তাও জানিয়েছেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা টানাপড়েন গেছে। তবে এখন আমরা পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা করছি।’ বিসিবির প্রস্তাবিত সূচিতে সেপ্টেম্বরের ১, ৩ ও ৬ তারিখে ওয়ানডে এবং ৯, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। বিসিবি নিজস্ব ওয়েবসাইটে বৈশ্বিক ও ঘরোয়া সম্প্রচার বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছে, তাতে আছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ, পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি, যে ম্যাচগুলো হয়ে যাবে এই বছরের জুন মাসের মধ্যেই। সেপ্টেম্বরের ভারত সফরের স্বত্ব এখনই বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিচ্ছে না বিসিবি, অন্যদিকে বিসিসিআইও ম্যাচগুলো রাখেনি তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সূচিতে। যে কারণেই সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা।