২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর চকবাজার কেল্লার মোড় আরঅ্যান্ডসি রোডের একটি পলিমার কারখানায় খুন হন নিরাপত্তাকর্মী মো. মফিজ (৫৫)। এ হত্যায় ১১ জনকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী রাজিয়া বেগম। আসামিদের মধ্যে একজন ১৭ বছর বয়সী শিশু (আইনি বাধ্যবাধকতায় নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না)। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। আইন অনুসারে ওই শিশুর বিচারের জন্য মামলার নথি ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি পাঠানো হয় শিশু আদালতে। ৩১ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় শিশু আদালত। বিচারের সেই যে শুরু, এখনো তা নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ শিশু আদালতের বিচার ৩৬০ দিনে মামলা শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে, যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ চলমান এ মামলায় ১৯ সাক্ষীর মধ্যে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র একজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়েছে। আর এ দিকে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে শিশুটি এখন ৩১ বছরের পরিপূর্ণ যুবক। তার আইনজীবী জানান, ইতিমধ্যে সেই ‘শিশু’ বিয়ে করে সংসার করছেন। কিন্তু মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার জেরে এখনো তাকে নিয়মিত শিশু আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
এক শিশুর জামিনের রায়ের পর্যবেক্ষণে ২০১৯ সালে আগস্টে হাইকোর্ট বলেছিল, শিশু আইন ও আদালত নিয়ে বিচারিক বিশৃঙ্খলা চলছে। শিশু আইনে সাংঘর্ষিক অবস্থা, অসঙ্গতি, অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি অবিলম্বে দূর করতে সরকারকে তাগিদ দেয় হাইকোর্ট। তবে বাস্তবতা হলো সেই বিচারিক বিশৃঙ্খলা এখনো দূর হয়নি।
সারা দেশের শিশু আদালতগুলোতে বিচারাধীন ৪৪ হাজার ৫১৩ ফৌজদারি মামলার মধ্যে পাঁচ বছর বা এর বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে ২ হাজার ৮৩৩ মামলা। অর্থাৎ এসব মামলায় আইনের আওতায় আসা শিশুদের প্রায় সবাই এখন যুবকে পরিণত হলেও মামলার বেড়াজাল থেকে বেরোতে পারছেন না।
শিশুদের সুরক্ষা, তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যহত হতে না দেওয়া, আইনের সংস্পর্শে বা আইনের সঙ্গে সংঘাতে আসা শিশুদের স্পর্শকাতর বিবেচনায় বিচারের মাধ্যমে তাদের সংশোধনের সুযোগের লক্ষ্যে ‘দ্য চিলড্রেন অ্যাক্ট, ১৯৭৪’ প্রণয়ন করা হয়। এ আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করার বিধান করা হয়। তবে, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়ন এবং যুগোপযোগী শিশু আইন করার লক্ষ্যে ১৩ বছর আগে ১৯৭৪ সালের আইনটি রহিত করে ‘শিশু আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে আন্তর্জাতিক আইন, সনদ ও বিধান মেনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সব ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হবে বলে বিধান করা হয়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রচলিত দন্ডবিধির (পেনাল কোড) ৮২ ধারা অনুযায়ী, ৯ বছরের নিচে এবং ৮৩ ধারার বিধান অনুযায়ী, ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী বুদ্ধি বা শারীরিক প্রতিবন্ধী কোনো শিশুর কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
শিশু আইন অনুসারে আইনের আওতায় আসা শিশুদের আসামি বলা যায় না। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, শিশু আইনে বিচার শাস্তি বা দৃষ্টান্তমূলক নয়, সংশোধনমূলক। তারা ফৌজদারি আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে জামিন নামঞ্জুর কিংবা আটকাদেশ হলে প্রচলিত কারাগারে না পাঠিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হয়।
আইনের বিধান ও সরকারের বিধিমালা অনুযায়ী দেশের প্রায় ১০০ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শিশু আদালত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। অর্থাৎ, যেসব আদালতে ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন, খুন, অপহরণের মতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর মামলার বিচার হয়, সেগুলোই নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য শিশু আদালত হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে (মহানগর পর্যায়ে একাধিক) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও শিশু আইন অনুসারে আইনের আওতায় আসা শিশুদের বিচার শুধুই শিশু আদালতে হওয়ার কথা।
শিশু আইন অনুযায়ী, যত গুরুতর অপরাধের অভিযোগই হোক না কেন, প্রমাণ সাপেক্ষে আইনের আওতায় আসা কোনো শিশুকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত আটকাদেশ দেওয়া যাবে। জামিন নামঞ্জুর কিংবা আটকাদেশ হলে ১৮ বছর পর্যন্ত উন্নয়ন কেন্দ্রে এবং ১৮ বছর পার হলে সাধারণ কারাগারে রাখা যাবে।
শিশু আইনে ৩৬০ দিনে (এর মধ্যে সম্ভব না হলে আরও ৬০ দিন) মামলা নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক। আদালত সংশ্লিষ্ট উভয়পক্ষের কয়েকজন আইনজীবী বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে এমন নজির তারা দেখেননি।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সনদ ও শিশু আইন অনুযায়ী শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা ও তা কার্যকরে রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। শিশু আইনে বিচার দীর্ঘায়িত হলে ন্যায্যতার নীতি লঙ্ঘন হয়, অপরাধপ্রবণতা বেড়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচার বিলম্ব ও আলাদা শিশু আদালতের অভাব শিশুদের পুনর্বাসনের সুযোগ নষ্ট করে, তাদের অপরাধপ্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য চরম ক্ষতিকর।’ তিনি বলেন, ‘বিচার চলাকালে কোনো কোনো শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। এতে বিচার নীতির যে মৌলিক উদ্দেশ্য (পুনর্বাসন ও সংশোধন) তা ব্যর্থ হচ্ছে।’ ‘দ্রুত বিচার, কার্যকর ও পর্যাপ্ত শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা এবং শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত কর্তব্য’ বলে মনে করেন তিনি।
প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় আইনের আওতায় আসা শিশুটির আইনজীবী মো. ইমরান হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসারি একজন মানুষ ১৪ বছর ধরেই শিশু আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। মামলা কবে শেষ হবে প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর থাকে না।’
বিচারাধীন ৪৪ হাজার ৫০০ মামলা : সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত শিশু আইনে সারা দেশের শিশু আদালতগুলোতে ৪৪ হাজার ৫১৩ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে পাঁচ বছর বা এর বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৮৩৩টি।
এর মধ্যে ঢাকার ৯টি শিশু আদালতে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল) ৪ হাজার ২২৪ মামলা বিচারাধীন। এসব মামলার মধ্যে ৪৯০ মামলা বিচারাধীন পাঁচ বছর বা এর বেশি সময় ধরে। চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ৭টি শিশু আদালতে বিচারাধীন ২ হাজার ৫৬৪ মামলা। এর মধ্যে পাঁচ বছর বা এর বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ১০৪ মামলা। এ ছাড়া রাজশাহী শিশু আদালতগুলোতে ১ হাজার ১০৯ মামলা, খুলনার শিশু আদালতগুলোতে ৪৪৬ মামলা, বরিশালের শিশু আদালতগুলোতে ১ হাজার ৭৭ মামলা, সিলেটের শিশু আদালতগুলাতে ১ হাজার ৪৬৬ মামলা, রংপুরের শিশু আদালতগুলোতে ১ হাজার ১৯৬ মামলা এবং ময়মনসিংহের শিশু আদালতগুলোতে ১ হাজার ৫৩৪ মামলা বিচারাধীন।
সারা দেশের বিচারাধীন মামলার জেলাওয়ারী তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ মামলা বিচারাধীন ঢাকার আদালতগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ৪৯ মামলা বিচারাধীন রাঙামাটি জেলার শিশু আদালতে।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) অ্যাডভোকেট নাছিমা আকতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশু ধর্ষণ ও যৌতুকের মামলায় আলাদা আদালত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালতে মামলার চাপ কিছু কমেছে। তবে সাক্ষীর গড় হাজিরায় শিশু আইনের মামলা বিলম্ব হয়। তিনি বলেন, ‘শিশু আইনে কিছু লঘু মামলায় আপস হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো আমরা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় সাক্ষী না এলে মামলা দীর্ঘায়িত হয়।’
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, “ওই সময়ে (২০১৯ সালে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণ) ‘বিশৃঙ্খলা’ শব্দটি ছিল এমন যে, একটা সিস্টেম চালু আছে, তাতে কিছু অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট তো আরও ভয়াবহ। এখন তো সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ বা রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের মামলা নিষ্পত্তিতে গতি তো দেখি না।’
তিনি বলেন, ‘সরকার যেসব পদক্ষেপ নেয়, তাতে মামলার জট কমে না বরং বাড়ে। বিচার বিভাগ নিয়ে একটা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া সামনের দিনগুলোয় খুব ভালো কিছু আশা করতে পারছি না।’
শিশু আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
///////////////////////////// ইনফোগ্রাফ
শিশু আইনের মামলার চিত্র (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত)
ক্স মোট বিচারাধীন মামলা ৪৪,৫১৩
ক্স ৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ২,৮৩৩
থথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথথ
জেলা ও মহানগরে বিচারাধীন মামলা
অঞ্চল আদালতের সংখ্যা মোট বিচারাধীন মামলা ৫+ বছর ধরে বিচারাধীন
ঢাকা ৯টি ৪,২২৪ ৪৯০
চট্টগ্রাম মহানগর ৭টি ২,৫৬৪ ১০৪
রাজশাহী - ১,১০৯
খুলনা - ৪৪৬
বরিশাল - ১,০৭৭
সিলেট - ১,৪৬৬
রংপুর - ১,১৯৬
ময়মনসিংহ - ১,৫৩৪