টাইব্রেকারে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা বাংলাদেশের

অতীতের চোখ রাঙানি ছিল। সাফের ফাইনাল মানেই হৃদয়ভাঙার বেদনা সঙ্গী বাংলাদেশের। আগের ৯ ফাইনালের আটটিতেই ভারতের কাছে হারে, তাই শঙ্কা বাসা বেঁধেছিল। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য থাকার পর যখন শিরোপাভাগ্য টাইব্রেকারে গড়াল, সেই আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। তবে স্নায়ুর চাপ সামলে এবার আর অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেয়নি বাংলাদেশ। ভারতকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা নিজেদের করেই রাখল বাংলাদেশের যুবারা।

টাইব্রেকারে ভারতের ঋষি সিংয়ের নেওয়া প্রথম শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দিয়ে দলের জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ গোলকিপার ইসমাইল হোসেন ফাহিম। এরপর মোর্শেদ আলী, চন্দন রায় ও আব্দুল রিয়াদ ফাহিম ঠিকঠাক পোস্টে বল জমা করেন। ভারতের হয়ে পরের তিন প্রচেষ্টায় গোল করেন মোহাম্মদ আরবাস, আহনসাংবাম স্যামন ও বিশাল যাদব। এর পরেই ভারত কিপার সুরাজ সিং ব্যথা পাওয়ার ভান করে মাঠে শুয়ে পড়েন। সেবা নেওয়ার নামে নষ্ট হয় ৩ থেকে ৪ মিনিট। তাতেই মনোযোগ টলে যায় বাংলাদেশের হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসা স্যামুয়েল রাকসামের। তার শট ক্রসবারে বাধা পেয়ে ফিরে এলে টাইব্রেকারে হয় ৩-৩ সমতা।

তবে ভাগ্য সহায় বলেই ভারতের ওমাং দোদুমের শট বার উঁচিয়ে বাইরে যায়। শিরোপাভাগ্য তখন নির্ভর করছিল রোনান সুলিভানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এ ফরোয়ার্ড বাঁ দিকে শটটি নেন। ভারত কিপার ঝাঁপিয়েছিলেন তা রুখতে। তবে পারেননি, বল জালে জড়ালেই শুরু হয় বুনো উল্লাস। মালে ন্যাশনাল স্টেডিয়াম তখন পরিণত হয় এক টুকরো বাংলাদেশে। হাজার হাজার সমর্থক তখন গ্যালারিতে পাগলপ্রায়। ভারতকে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখার উদযাপনটা বাংলাদেশের তরুণরা করলেন মনে রাখার মতো।

সিনিয়র থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক এ নিয়ে দশম ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুদল। ভারতকে হারিয়ে একবারই কেবল শিরোপা উৎসব করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে সিলেটে অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাটাও বাংলাদেশ জিতেছিল টাইব্রেকারে ভাগ্য নিজেদের করে। এরপর থেকেই ফাইনালে শেষ হাসি হেসেছে ভারত। ১১ বছর পর সেই টাইব্রেকারেই ভারতের হৃদয় ভাঙলেন রোনান-ইসমাইলরা।

অনূর্ধ্ব-১৮, ১৯ ও ২০ ক্যাটাগরিতে সাফের আসর হয়েছে আটটি। এর মধ্যে চারবার সেরা ভারত। বাংলাদেশ ও নেপাল দুবার করে সেরা হয়েছে। ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-২০ আসরের ফাইনালে বাংলাদেশ নেপালকে হারিয়েছিল ৪-১ ব্যবধানে।

নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ডাগআউটে ফেরা কোচ মার্ক কক্স একাদশে একটি পরিবর্তন এনেছিলেন। সানি দাসের জায়গায় খেলান আব্দুল রিয়াদ ফাহিমকে।

ম্যাচটা বাংলাদেশ জিততে পারত টাইব্রেকারের অনিশ্চয়তার আগেই। প্রথমার্ধেই একাধিক গোলের সুযোগ তারা নষ্ট করে। ভারতকে কোণঠাসা করে একের পর এক আক্রমণ শানিয়েছে রোনান, নাজমুল হুদা ফয়সাল, মোর্শেদ ও মানিককে নিয়ে গড়া বাংলাদেশের আক্রমণভাগ। ম্যাচের ১৩ মিনিটে রোনানের ফ্রি-কিকে মিঠু চৌধুরীর হেড অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে প্রথম হতাশ হতে হয়। এর পাঁচ মিনিট পর বাঁ দিক থেকে মানিকের ক্রসে ঠিকঠাক পা ছোঁয়াতে পারেননি রোনান। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে ভারতের সুযোগ এসেছিল। ছোট বক্সের ওপর থেকে ঋষি ভলি করতে চেয়েছিলেন, তবে ঠিকঠাক হয়নি সেটা। কামাল মৃধা বল ক্লিয়ার করলে জদরিক আব্রানাচেস দুর্বল হেড নেন, যা গ্লাভসে জমা পড়ে বাংলাদেশ কিপার মাহিনের। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে সতীর্থের পাস এয়ে বুটের টোকায় ভাসিয়ে ভলি করেছিলেন রোনান, তবে তা পোস্টে থাকেনি।

দ্বিতীয়ার্ধে গোলের জন্য মরিয়া হতে দেখা যায়নি কোনো দলকেই। বিশেষ করে প্রথমার্ধের গতি দেখা যায়নি বাংলাদেশের খেলায়। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে নাজমুল হুদা ফয়সালের জায়গায় মাঠে আসেন রোনানের ভাই ডেকলান সুলিভান। যোগ করা সময়ে দুই ভাইয়ের রসায়নে গোল পেতে পারত বাংলাদেশ। ডেকলানের থ্রু পেয়ে বক্সে ঢুকেই শট নিয়েছিলেন রোনান। তবে ভারত কিপার এগিয়ে এসে শরীর দিয়ে সে প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দিলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। ভারতের প্রথম শট ঠেকিয়ে ফাহিম এবং শেষ শটে গোল করে শিরোপা নিশ্চিত করে নায়ক বনে যান রোনান।

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার মালদ্বীপের মালেতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে ভারতকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ দল।