সরকার গঠনের পর বিএনপির প্রথম স্থায়ী কমিটির সভা আজ

১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে বিএনপি। এতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল রাজপথে কর্মসূচি করায় বিকল্প কর্মসূচি দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ শনিবার রাতে গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সভা ডেকেছেন। স্থায়ী কমিটির বৈঠকের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর দলের পুনর্গঠনে জোর দিতে চান দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উদ্দেশ্য দলকে শক্তিশালী করা এবং রাজপথে আন্দোলন- সংগ্রামের জন্য তৈরি করা। ইতিপূর্বে দলের চেয়ারম্যান দলকে শক্তিশালী করতে দলের পুনর্গঠনের বিষয়ে তার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। এখন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতা তথা স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মতামত নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন চেয়ারম্যান। এ ছাড়া সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি রয়েছে। এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর বাইরে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়। রাজপথে বিরোধী দলকে মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণ নিয়ে সভায় আলোচনা হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির এবারের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ‘জেনারেশন গ্যাপ’ কমিয়ে আনা। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণ ও রাজপথের লড়াকু নেতাদের জায়গা করে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে দিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে দলের মধ্যে। বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উইংগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে, যাতে রাজপথে যেকোনো কর্মসূচিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হয়। অঙ্গ সংগঠনগুলো ঢেলে সাজালে রাজপথে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করা সহজ হবে।

এদিকে দলটির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলকে দমন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ব্যাপক নির্ভরতার নজির রয়েছে। তবে বিএনপি নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তারা সেই পথে হাঁটবেন না। বর্তমান প্রধান বিরোধী দল ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’কে প্রশাসনিকভাবে নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবেই মোকাবিলা করতে চায় বিএনপি। তাছাড়া আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো তার সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠন করে দলকে সুসংগঠিত রাখাই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’

সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারি স্থায়ী কমিটির এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর এবং সরকার গঠনের এই পর্যায়ে এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বৈঠকের এজেন্ডা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে দলের পুনর্গঠনের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বৈঠকের এজেন্ডার বিষয়ে কোনো ধারণা দেওয়া হয়নি।’

১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে এক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বিএনপির পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করেন।  কারণ মূল দলের পাশাপাশি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও কৃষক দলের শীর্ষ নেতারাও এখন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। সংগঠনগুলোর কার্যক্রম গতিশীল রাখতে তাই দ্রুত নতুন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে। পদপ্রত্যাশী নেতারা ইতিমধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছেন। সরকার গঠনের পর গত ২৮ মার্চ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসেছিলেন। কার্যালয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে দলের পুনর্গঠনসহ সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

এদিকে জুলাই সনদ কার্যকর এবং গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য জোট। কর্মসূচি অনুযায়ী, আজ শনিবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ করবে এই জোট। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই কথা জানান জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার-ই করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে সরকার। জনগণের রায় মূল্যায়ন না করলে, রাজপথে আন্দোলনের বিকল্প নেই।’

দলটির নেতারা জানান, জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে কর্মসূচি আসতে পারে। তারা সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপি ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ ছাড়া দলটির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দমননীতিসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন বিএনপি তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বড় একটি অংশ সচিবালয় ও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় বেশি সময় দিচ্ছেন। তাই সরকার গঠনের পর থেকেই দলীয় কার্যক্রম ধীরগতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের নেতাকর্মীরা। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা। এমন পরিস্থিতিতে দলকে শক্তিশালী করতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

তারা জানান, দলকে সাংগঠনিকভাবে গতিশীল রাখতে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সরকার গঠন করতে গিয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে। তারা সরকারি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। এ অবস্থায় সংগঠনকে গতিশীল রাখতে তাদের জায়গায় কর্মঠ এবং দলকে সময় দিতে পারবেন এমন নেতাদের পদায়ন করা প্রয়োজন।