ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী চৌরাস্তা এলাকায় এসআর গ্যাস প্রো লাইটার ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত ছয়জনের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অঙ্গার ছয়জনের মধ্যে কে পুরুষ, কে নারী তাও বোঝার উপায় নেই বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিকা-ে আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন, তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যতদূর জানা গেছে কারখানাটির বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই। গত বছরও সেখানে আগুন লেগেছিল।
গতকাল শনিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের আমবাগিচা এলাকার ফ্যাক্টরিতে এ ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার প্রচেষ্টায় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, ফায়ার সার্ভিস খবর পাওয়ার পরপরই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কাজ শুরু করে ইউনিটগুলো। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় প্রথমে তিনটি ইউনিট, পরে আরও চারটি ইউনিট যোগ দিয়ে মোট সাতটি ইউনিট একসঙ্গে কাজ করে। এতে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগুন ছড়িয়ে পড়া রোধ করা গেছে। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ হয় ৪টা ৪৪ মিনিটে। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করে। রাত দশটার দিকে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে নিহতদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। শরীর এমনভাবে পুড়ে গেছে, নিহতরা পুরুষ না কি নারী তা বোঝা যাচ্ছে না। বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। মৃতদের মিডফোর্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সরেজমিন দেখা যায়, গ্যাস রিফিলের মেশিনারিগুলো দুমড়ে-মুচড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আগুনে পুড়ে কারখানাটির অবশিষ্ট কিছুই নেই। ছোট ছোট গ্যাসলাইটারগুলো পুরো ফ্লোরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। আগুনের তাপে পুরো কারখানার ফ্লোর ফেটে ফেটে ভেঙে পড়েছে। উদ্ধারকারী দল কারখানা থেকে বড় বড় ২০টির বেশি গ্যাস সিলেন্ডার উদ্ধার করে পাশের একটি মাঠে রেখেছে। এই সিলেন্ডারগুলো একসঙ্গে ব্লাস্ট হলে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যেত বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন। কারখানার চারপাশের টিন আগুনে পুড়ে গেছে। ভবনের একপাশে পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। পুরো কারখানায় মূল ফটকের গেট বাদে আগুনে পোড়ার হাত থেকে কিছুই রক্ষা পায়নি।
এদিকে স্বামীর কথায় বছরখানেক আগে চাকরি ছেড়েছিলেন শাহিনূর আক্তার (৩৫)। কিন্তু অভাব-অনটনের কারণে তিন দিন আগে আবার এই কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অগ্নিকা-ের পর থেকে তার খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা। শাহিনূরের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি। তিনি স্বামীর সঙ্গে কেরানীগঞ্জের গোলামবাজারে থাকেন। গতকাল সন্ধ্যায় অগ্নিকা-ে পোড়া স্তূপে পরিণত হওয়া কারখানটিতে শাহিনূরের খোঁজ করতে দেখা যায় স্বজনদের। মুঠোফোনে শাহিনূরের ছবি দেখিয়ে কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। শাহিনূরের চাচাতো ভাই সাগর হোসেন বলেন, আমার চাচাতো বোন সকালে কাজে আসছিল। আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি, কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।
শাহিনূরের মতো পারভীন আক্তারও কাজ করতেন ওই গ্যাসলাইটার কারখানায়। আগ্নিকা-ের পর তাকেও খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনরা। পারভীন আক্তারের এনআইডি কার্ড নিয়ে লোকজনকে দেখাচ্ছিলেন ছেলে জাহিদ। পারভীন আক্তারের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি সন্তানের সঙ্গে গোলামবাজারের ওয়াশমিলের গলিতে থাকেন। তার ছেলে পেশায় দিনমজুর। তিনি দেড় বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করতেন। তার নাতনি মিমও গত ছয় মাস ধরে কারখানায় তার সঙ্গে কাজ করেন।
দিনমজুর জাহিদ বলেন, সকালে আমার মা কাজে এসেছিল। এই কারখানায় আমার মেয়ে মিম আক্তারও কাজ করে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে বের হয়ে বাসায় গিয়ে বলে, কারখানায় আগুন লেগেছে। দাদিকে খুঁজে পাচ্ছি না। এ কথা শুনে আমি দৌড়ে এসে দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চারদিক অন্ধকার। আগুন নেভার পর থেকে সব জায়গায় খুঁজছি; কোথাও মাকে পাচ্ছি না।
ওই কারখানাটির পাশেই একটি বাসায় থাকেন স্থানীয় মো. মাসুদ। অগ্নিকা-ের পর মৃতদেহ বের করার কাজে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন। মাসুদ বলেন, আমি ঘুমে ছিলাম। হঠাৎ বাসার লোকজন বলে আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আসি। এসে দেখি কয়েকজন বের হয়েছে। তারা জানিয়েছিল ভেতরে কেউ নেই। কিন্তু আগুন নেভার পর কয়েকজনের মরদেহ বের করা হয়েছে। সবার মরদেহ পুড়ে গেছে। শুধু একজন নারীর চেহারা চেনা যাচ্ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পোড়া স্তূপ সরানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি ভেকু আনা হয়। ভেকু এলে আর মৃতদেহ আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করে দেখা হবে।
ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় নুর ইসলাম জানান, হঠাৎ করেই কারখানার ভেতরে বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর মুহূর্তেই আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কারখানায় থাকা দাহ্যপদার্থের কারণে আগুন আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কাইয়ুম নামে অপর একজন জানান, এই কারখানায় গত বছরও আগুন লেগেছিল, কিন্তু প্রশাসন কোনো ব্যবস্থায় নেয়নি তখন। এ বছর আবার লাগল। মাসুদ নামে প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার দারোয়ান ভেতরে লোকজন রেখে তালা আটকিয়ে দেয়, যেন বাইরের কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। পরে ভেতরে আগুন বেড়ে গেলে তালা খুলে দেয়। ভেতরে শতাধিক শ্রমিক ছিল, কতজন আগুনে মারা গেছে তা নিশ্চিত নয়। কেরানীগঞ্জের আনাচে-কানাচে এমন কারখানার অভাব নেই। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক ফায়ার ফাইটার বলেন, কারখানায় গ্যাসলাইটার তৈরির কাঁচামাল ও দাহ্য উপকরণ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে আগুন আশপাশের ভবনগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে। তবে আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ, ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে পরে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
অগ্নিকা-ের ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করছেন কারখানার কর্মচারীরা। স্থানীয় বাসিন্দা মো. মকবুল জানান, গত বছরও এ কারখানাটিতে আগুন লেগেছিল। তখন এমন ভয়াবহতা হয়নি। তবে আগুনে চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন প্রশাসন থেকে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে আর কিছুই হয়নি। সিলগালা করলে আজকে ছয়টি প্রাণ ঝরত না। পার্শ্ববর্তী বাড়ির ভাড়াটিয়া সাহেব আলী জানান, আমাদের জানামতে, কারখানটির কোনো কাগজ নেই। অবৈধভাবেই চলছে। গত বছরও দুর্ঘটনা ঘটেছিল। পরে সবাইকে ম্যানেজ করেই হয়তো আবার চালু করেছে।
কারখানাটির কোনো কর্মচারী যদি নিখোঁজ থাকে, তাহলে থানায় অভিযোগ করার অনুরোধ জানান কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে মৃতদের লাশ হস্তান্তর করা হবে। যদি কেউ নিখোঁজ থাকে বা লাশের দাবি করেন, তাও ডিএনএ টেস্টের মাধেমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নিহতদের কোনো স্বজন থানায় আসেনি। তিনি আরও বলেন, কারখানাটির বৈধ কাগজপত্র ছিল কি না তা অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে। আমরা যতদূর জানতে পেরেছি, গত বছর এ কারখানাতেই আগুন লেগেছিল।
এদিকে কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে গ্যাসলাইটার কারখানায় আগুনে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। এই প্রাণহানির ক্ষতি অপূরণীয়।’ বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী হতাহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দেন তিনি।