জ্বালানি তেল আমদানিতে ডিজেল এগিয়ে, পিছিয়ে ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল)। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের এক মাসে দেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে ক্রুড অয়েল ছাড়া অন্য সব ধরনের তেল আমদানি বেশি হয়েছে। শুধু জ্বালানি তেলই নয় এলপিজি-এলএনজি আমদানিও অন্য যে কোনো মাসের চেয়ে বেশি হয়েছে। দেশে তেলের সরবরাহ ঠিক থাকলেও শুধু ভোক্তা পর্যায়ে মজুদ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক বাড়ছে।
ভোক্তা পর্যায়ে মজুদের কথা উল্লেখ করে চট্টগ্রাম পেট্রোলপাম্প মালিক সমিতির সভাপতি আবু তৈয়ব দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে পেয়েছি মার্চেও কিন্তু সমপরিমাণ তেল পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি।
তাহলে তেলের সংকট হচ্ছে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে আবু তৈয়ব বলেন, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলচালকরা পেট্রোল ও অকটেন মজুদ করছে। তারা সকালে এক পাম্প থেকে কিনছে আবার ঘুরে গিয়ে আরেক পাম্প থেকে কিনছে। তাদের এই চাহিদার কারণে তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে ডিজেলচালিত গাড়ির কিন্তু কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
তাহলে কি আমাদের ডিজেলে কোনো সমস্যা নেই? এই প্রশ্নের জবাবে আবু তৈয়ব বলেন, ডিজেল পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।
আবু তৈয়বের এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে প্রাপ্ত উপাত্তে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চ মাসের তুলনায় গত মার্চে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেল ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। তবে একই সময়ে ক্রুড অয়েল আমদানি কমেছে ৮০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মুখপাত্র ও সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় গত মার্চে আমাদের রাজস্বও বেশি আহরণ হয়েছে। তবে ক্রুড অয়েল আমদানি কমলেও এলপিজি-এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়েছে।
বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল দেশে নিয়ে আসে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে গত মাসে কোনো ক্রুড অয়েলের জাহাজ আসতে পারেনি জানিয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের জন্য কেনা ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল নিয়ে হরমুজ প্রণালিতে আটকে আছে এমটি নরডিক পলুকস নামের জাহাজটি। এই জাহাজটি দ্রুত ছাড় করিয়ে আনতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করা জাহাজটি ইরান সরকারের ক্লিয়ারেন্স পেলে ১৮ বা ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশে আসতে পারে। এ ছাড়া মে মাসে আরও তিনটি জাহাজ ক্রুড অয়েল নিয়ে আসতে পারে। প্রতিটি জাহাজে এক লাখ টন করে ক্রুড অয়েল রয়েছে।
ক্রুড অয়েলের অভাব মেটাচ্ছে পরিশোধিত তেল : ক্রুড অয়েলের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। রাষ্ট্রায়ত্ত এই তেল পরিশোধনাগার প্ল্যান্টটি বছরে ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে গড়ে ৬ থেকে ৭ লাখ টন ডিজেল উৎপাদন করে। এ ছাড়া পেট্রোল ও অকটেনও রিফাইন করে বলে জানান সংস্থাটির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ক্রুড অয়েলের অভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি হয়তো বন্ধ হতে যাচ্ছে; কিন্তু পরিশোধিত তেলের আমদানি তো বেড়ে গেছে। যে তেল আমি পরিশোধন করে বের করতাম সেই তেল আমি কিনে আনছি। আর সেজন্যই বাজারে ডিজেলের সমস্যা হচ্ছে না। তবে পেট্রোল ও অকটেন সংকট সৃষ্টি করছে মানুষ।
প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলমের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হয়তো আমরা ক্রুড অয়েলের জাহাজ আনতে পারিনি; কিন্তু এর বিপরীতে পরিশোধিত তেলের আমদানি কিন্তু বাড়ানো হয়েছে। তাই বাজারে কিন্তু তেলের সরবরাহে সমস্যা নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর স্বাভাবিক মেইনটেনেন্স হিসেবে ১০ থেকে ১২ দিন ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ থাকে। এখন হয়তো সেই মেইনটেনেন্স করে নেওয়া যাবে এবং এই সময়ের মধ্যে ক্রুড অয়েল চলে আসবে।
বেড়েছে এলপিজি ও এলএনজি আমদানি : চট্টগ্রাম কাস্টমসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এলপিজি ও এলএনজি আমদানি বেড়েছে ৯৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গত বছরের মার্চে ৩৮ হাজার ৪০৮ মেট্রিক টন এলপিজি ও এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল, সেখানে গত মার্চে করা হয়েছে ৭৫ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, জ্বালানি আমদানি বেড়েছে কোনো সন্দেহ নেই। এখন ভোক্তা পর্যায়ে মেইনটেন করতে না পারার কারণে এবং আমাদের মানসিকতার কারণে সংকট দেখা দিচ্ছে। মজুদের মানসিকতা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে বলে সরকার বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ ৯ হাজার ৯১৭ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। তবে আমদানির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।