ঢালাও ফাঁসির শাস্তি পেলেন বিচারক

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম

সময়ের হিসাবে সাত বছরের বেশি। ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার ঘটনা আলোড়ন তৈরি করেছিল সারা দেশে। উচ্চ আদালতে সেই হত্যা মামলার রায় হয়েছে গতকাল। এতে ফেনীর বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে মাত্র দুজনের সাজা বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজনের সাজা কমে হয়েছে যাবজ্জীবন, আর বাকি ১০ জন পেয়েছেন খালাস। ২০১৯ সালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ ১৬ আসামির সবাইকে প্রাণদণ্ড দিয়ে যে রায় দিয়েছিলেন তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট। এমনকি তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

উচ্চ আদালত বলেছে, রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারক মামুনুর রশিদ তার বিচারিক মানসিকতা ও বিচারিক বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করেননি। এ কারণে তাকে ফৌজদারি মামলা পরিচালনা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা নিতে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার এ বিচারিক কর্মকর্তা বর্তমানে নিম্নতম মজুরি বোর্ডে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি এই প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে যোগ দেন।

১৬ জনের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তখনকার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, তার সহযোগী ও ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীম। হাইকোর্টে যাদের মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়েছে তারা হলেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আব্দুল কাদের, প্রভাষক আবছার উদ্দিন, শিক্ষার্থী কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মহি উদ্দিন শাকিল, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি এবং মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন।

ফেনীর সোনাগাজীতে স্থানীয় ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (পরে বরখাস্ত) এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে একই মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি যৌন নির্যাতনের অভিযোগে থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষ ও তার অনুসারীদের রোষানলে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সকালে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টার ভবনের ছাদে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় সিরাজসহ ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই। বিচারের শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারক মামুনুর রশিদ। এরপর ডেথ রেফারেন্স মামলা আসে হাইকোর্টে। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামিরা আপিল ও জেলা আপিল করেন। হাইকোর্টে গত ২৮ জুলাই এ মামলায় শুনানি শুরু হয়। মোট ১৭ কার্যদিবস রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষে শুনানি শেষে গতকাল রায় দেয় আদালত।

হাইকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছে : আলোচিত এ মামলার রায় শুনতে গতকাল সকাল থেকে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট আদালতের (২৯ নম্বর এজলাস) সামনে ভিড় করেন ভুক্তভোগী পরিবার ও আসামিদের স্বজন, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারকরা। পৌনে দুই ঘণ্টায় পঠিত রায়ে নুসরাত হত্যা মামলায় ঢালাও ফাঁসির রায় দেওয়ায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তখনকার বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক বিবেচনাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

আদালত বলেছে, ঢালাও ফাঁসি দিয়ে আসামিদের পরিবারকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বিচারের সময় বিচারকদের বিচারিক মননের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন দিয়ে ১০ জনকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। এ রায় শুনে আদালতের বারান্দায় অবস্থান করা দণ্ড থেকে মুক্ত কয়েকজন স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিদের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ সম্পর্কে আদালত বলেছে, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া অনেকটা ‘মাইন্ডলেস সেন্টেন্স’ অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, সেটা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।”

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি (বিচারিক আদালতের বিচারক) এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কাকে কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, কার কতটুকু সম্পৃক্ততা, সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং, অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন।’

রায়ে সন্তোষ জানিয়ে খালাস পাওয়া কামরুন্নাহার মনির আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘বিচারিক আদালত নির্বিচারে ফাঁসি দেওয়ার কারণে প্রতিটা পরিবারের ওপর একটা ডিভাস্টিটিং ইফেক্ট (বিপর্যয়) নেমে এসেছে। এজন্য বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, “অতিমাত্রায় কোনো ফৌজদারি মামলায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হলে অনেক সময় নিম্ন আদালতের বিচারকদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিচারের আগেই অনেক সময় টেলিভিশনে, পাবলিক ডোমেনে বিচার হয়ে যায়। এগুলো হলে প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

শিশির মনির বলেন, ‘ঘটনাস্থলে সিসি ক্যামেরা ছিল। অথচ প্রসিকিউশন পক্ষ কিংবা তদন্ত সংস্থা এটি উপস্থাপন করেনি। এই সিসি ক্যামেরা উপস্থাপন করা হলে বোঝা যেত কে কাকে কোথায় কীভাবে মেরেছে। আশপাশের কেউ জানল না। এটা একটা রহস্য থেকে গেল।’

আসামি নুর উদ্দিনের (মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন) আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যা মামলার মতো ঘটনায় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সেনসেশন তৈরি করা হয়। যখনই এটা সেনসিটাইজড হয়ে যায়, তখনই বিচারকদের ওপর সাংঘাতিক রকমের মানসিক এবং সামাজিক চাপ তৈরি হয়। ফলে তারা (বিচারক) গণহারে ফাঁসির রায় দেন।’

তিনি বলেন, ‘দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির যে ব্যাপক নির্ভরশীলতা, তা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা। মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রবণতার ব্যাপারে আজকের রায়ে একটা বড় ফাইন্ডিং দিয়ে বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রবণতা বিপজ্জনক এবং যেসব বিচারক এভাবে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকেন তাদের আইনের জ্ঞান, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেন্টেন্সিংয়ের ব্যাপারে, যে জ্ঞানের স্বল্পতা, সেটার ব্যাপারে হাইকোর্ট বিভাগ আলোকপাত করেছে। আজকের এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্সের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে।’

নুসরাতের মায়ের সন্তোষ, নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা : নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার মা শিরিন আক্তার। সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া এলাকায় নিজ বাড়িতে রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এই রায়ে মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। নুসরাত হত্যার পর অনেকে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেছিলেন। আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে এটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে আবারও প্রমাণিত হয়েছে।’

তবে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বাড়িঘরে আগুন দিয়ে আমাদের শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আমাদের পরিবারের নিরাপত্তা চাই।’

নুসরাতের পরিবারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ফেনী মডেল থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) পলাশ চন্দ্র রায় জানান, রায় কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত