প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চড়াই-উতরাই কমবেশি সব সময় থাকে। তবে সরকারি পর্যায়ে সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটেছে ১ বছর ৮ মাস আগে। কালেভদ্রে নানা উপলক্ষে সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা-সাক্ষাৎ হলেও তাতে সম্পর্কে ছন্দ ফেরেনি। এমন নয় যে এ বিষয়ে দুই রাজধানী ঢাকা ও দিল্লিতে যারা সরকারে আছেন, তাদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ কমবেশি দুই দিকেই আছে। ঢাকায় নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্কে বরফ গলানোর জন্য কিছুটা উদ্যোগী হয়েছে ভারত।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন দরকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় গতি আনা। আর দরকার জনস্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে নিয়মিত যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সরকারি সফরে আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেলে দিল্লি যাচ্ছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আমন্ত্রণে তার এ সফর।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী বুধবার জয়শঙ্কর ছাড়াও ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযুুষ গোয়েল, পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষাৎ করবেন।
দুই দিকের সরকারি ও বেসরকারি কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানো, গঙ্গাচুক্তি নবায়ন ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে তারা কথা বলতে পারেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে গতকাল রবিবার বলেন, এখন দুই দেশেই সরকারি পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে তা অর্থবহ করতে হলে এ প্রক্রিয়ায় গতি আনতে হবে।
হুমায়ুন কবীর বর্তমানে গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সব বিষয়ই আসার কথা। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ আছে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী ও পেট্রোলিয়ামমন্ত্রীর সঙ্গে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে ভারত থেকে পাইপলাইনে বাংলাদেশে ডিজেল আনা হচ্ছে। জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় জ্বালানি খাতে আরও বেশি সহযোগিতা চাওয়া হতে পারে।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আগে ভারত হয়ে ট্রানশিপমেন্টের মাধ্যমে অন্য দেশে রপ্তানি হতো। ২০২৪ সালের পর দেশটি বিধিনিষেধ আরোপ করায় বাংলাদেশের রপ্তানিতে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযুুষ গোয়েলের সঙ্গে আলোচনায় ভারত হয়ে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, ভারতে রপ্তানি বাড়ানো এবং সেখান থেকে জরুরি পণ্য আনা সহজ করার বিষয়গুলো তোলা হতে পারে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়েই হয়তো কথা হতে পারে।
হুমায়ুন কবীর বলেন, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের একটি বড় বিষয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তি করতে হলে দরকষাকষি শুরু করতে হবে, যা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া এখনো শুরুই হয়নি। উজানের দেশ হিসেবে এখানে ভারতের দিক থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান চুক্তি যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায় কার্যকর রেখেও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও ভারতের সম্মতি দরকার হবে।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটে। ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অন্যরা। সেদিন শেখ হাসিনা ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন। এরপর ঢাকায় ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তার দেড় বছরের শাসনামলে সম্পর্কে গতি ফেরেনি। নরেন্দ্র মোদি ও মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে ব্যাংককে গত বছর বৈঠক হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। ভারতীয় কূটনীতিকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি ঢাকায় নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থেকেছে।
গত ডিসেম্বরের (২০২৫) শেষ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর ভারত সরকার শোক ও সমবেদনা জানাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে পাঠায়। তিনি বিএনপির তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে (২০২৬) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে আসেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি।
দুই দিকের কূটনীতিকরা মনে করেন, জয়শঙ্কর এবং ওম বিড়লাকে পাঠানোর মাধ্যমে ভারত সম্পর্কে বরফ গলানোর ইচ্ছের ইঙ্গিত দেয়।
নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতির বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ,’ এটাই সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান দিক। পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব ঠিক রেখে এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের কূটনীতিকরা মনে করেন, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক টেকসই করতে হলে আস্থা ফেরাতে হবে। সম্পর্ক ভালো রাখার সুবিধা নাগরিকরা পেতে হবে। এক্ষেত্রে আঞ্চলিকভাবে বড় দেশ হিসেবে ভারতকে ‘সবক্ষেত্রে লাভবান’ হওয়ার মানসিকতা ছাড়তে হবে।