হোয়াইট হাউজ ও পেন্টাগন ইরান যুদ্ধ নিয়ে সফলতার দাবি করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও টানা হামলা মোকাবিলা করে চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে ইরান। দীর্ঘ এই যুদ্ধে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তার যুদ্ধ ক্ষমতা এখনো অটুট রয়েছে এমনটাই উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যৌথ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ভূগর্ভস্থ মিসাইল বাঙ্কার ও সাইলো (ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ঘাঁটি) খুঁড়ে, সেখান থেকে লঞ্চার বের করে আনছে ইরান। হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান সেগুলোকে ফের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ মিসাইল ও ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চার মজুদ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছিলেন, যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহে ইরানের ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে এবং তাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছে। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার হার ‘৯০ শতাংশ কমেছে’, ইরানের নৌবাহিনী কার্যত নিশ্চিহ্ন, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর দুই-
তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস এবং ইরানের আকাশে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অবশ্য হোয়াইট হাউজের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়। তাদের মতে, ইরানের মিসাইল সক্ষমতা শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেকটাই দূরে। হাতে থাকা ব্যালিস্টিক মিসাইল ও লঞ্চার দিয়ে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোতে এখনো ইরানের আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের ধারণা, ইরানের হামলা কমে যাওয়ার নেপথ্যে অন্য কারণ থাকতে পারে। তাদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কৌশলের অংশ হিসেবে হামলা থেকে বাঁচাতে অধিকাংশ মিসাইল লঞ্চার পাহাড়ের গুহা বা মাটির নিচের গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে ফেলেছে ইরান। সুযোগ বুঝে সেগুলো ফের ব্যবহার করা হতে পারে।
ইরান তাদের মিসাইল ছোড়ার সক্ষমতা যথাসম্ভব অক্ষত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য মূলত দুটি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং যুদ্ধ থামার পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা। অস্ত্রের মজুদ কমলেও বা লঞ্চার ব্যবহারে রাশ টানলেও ইসরায়েলের ওপর হামলা থামায়নি তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে দৈনিক গড়ে ২০টি মিসাইল ছুড়ছে ইরান। কখনো একটি বা দুটি করে ছোড়া হচ্ছে। গত শুক্রবার এক পশ্চিমা কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ৫০ থেকে ১০০টি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোন ছুড়ছে ইরান।
ইরানের বর্তমান প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে ধন্ধ রয়েই গেছে। কারণ বিভ্রান্তি ছড়াতে প্রচুর পরিমাণে নকল বা ছদ্মবেশী মিসাইল লঞ্চার ব্যবহার করছে তেহরান। ফলে ওয়াশিংটন যেসব লঞ্চার ধ্বংসের দাবি করছে, তার মধ্যে কতগুলো আসল তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে ঠিক কতসংখ্যক লঞ্চার ছিল, তার নিখুঁত পরিসংখ্যানও ওয়াশিংটনের কাছে নেই। ফলে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ের গুহা বা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ঠিক কতগুলো লঞ্চার থাকতে পারে, তার সঠিক মূল্যায়ন করাও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মনে হলেও আদতে অনেক বাঙ্কার, গুহা বা সাইলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। এর আগে সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের অর্ধেক মিসাইল লঞ্চারই এখনো অক্ষত রয়েছে।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, তাকে ‘নিরাপদ ও সুস্থ’ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দেশের ইতিহাসে অন্যতম সাহসী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছে। উদ্ধার হওয়া বৈমানিক একজন উচ্চপদস্থ কর্নেল।
গত শুক্রবার বিধ্বস্ত হওয়া এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের পাইলটকে সেদিনই উদ্ধার করা হলেও, দ্বিতীয় সদস্য (অস্ত্র কর্মকর্তা) নিখোঁজ ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযানটি নিখুঁত দাবি করলেও, বাস্তবে বেশ কিছু প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত দুটি পরিবহন বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে যায়। সেগুলো যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোরাই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিমানগুলো ধ্বংস করে দেয়। পরে অতিরিক্ত তিনটি বিমান পাঠিয়ে উদ্ধারকারী দল ও আহত সেনাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। তেহরানের দাবি, তারা একটি পরিবহন বিমান ও দুটি ব্ল্যাক-হক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের ৩৭তম দিনেও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে রামাত হোভাব এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আবুধাবির বোরুজ পেট্রোকেমিক্যাল কারখানার একাধিক স্থানে আগুন লেগেছে। আগুন লাগার পর পেট্রোকেমিক্যাল ক্ষেত্রটির কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলের জাফায় অবস্থিত বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্লাস্টার (গুচ্ছ) ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা দেশটির উপকূল থেকে ৬৮ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থানরত একটি ইসরায়েলি সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে।