সকালের সূর্য উঠেছিল স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু অনেক পরিবারের জন্য সেটিই ছিল সন্তানের জীবনের শেষ সকাল। কেউ জ্বরে কাঁপছিল, কেউ শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছিল; আবার কেউ মায়ের বুকে মাথা রেখে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল। চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে ছুটে আসা অভিভাবকদের চোখে ছিল তীব্র আশা সন্তানটা বাঁচবে। কিন্তু দিনশেষে সেই আশাই পরিণত হয়েছে অসহনীয় শোকে। হাসপাতালের করিডরে নিস্তব্ধতা। কোথাও চাপা কান্না, আবার কোথাও হাহাকার ভেঙে পড়ছে দেয়ালে দেয়ালে। কত স্বপ্ন ছিল। কত আশা ছিল। ফুটফুটে ফুলগুলো যেন নিমিষেই ঝরে যাচ্ছে। হামের লক্ষণ নিয়ে এক দিনেই ঝরে গেল আরও ১০ নিষ্পাপ শিশু। এ নিয়ে গত ২১ দিনে হামের লক্ষণ নিয়ে ১১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হামে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৭ জনের। ২১ দিনে ঝরে গেছে ১৩০ প্রাণ। শতাধিক পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে পরিবারে কিছু দিন আগেও ছিল কত আনন্দ আর কত উচ্ছ্বাস সবই এখন যেন ভুতুড়ে অন্ধকার। এত মৃত্যু শুধু কাঁদায় না, প্রশ্নও তোলে আমরা কি যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলাম? প্রতিটি শিশুমৃত্যু যেন আমাদের দায়িত্বহীনতার একেকটি প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। মহান বিপ্লবী চে গুয়েভারা নিহত হওয়ার পর কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন তার বিখ্যাত পঙ্তি ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।’
হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সেই পঙ্তিই যেন কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘তোমাদের মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়।’ এই মৃত্যুর দায় রাষ্ট্রকে এবং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে নিতে হবে।
হামে সারা দেশের হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে। ভর্তি যেমন বাড়ছে, তেমন মৃত্যুও। প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিশুর প্রাণহানি হচ্ছে। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগেরই ছিল অপুষ্টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ভাইরাস সহজে তাকে কাবু করে ফেলে। সে জন্য সরকারও পুষ্টির বিষয়টিতে জোর দেওয়ার কথা ভাবছে।
হামের লক্ষণ নিয়ে এক দিনে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন খুলনায়, তিনজন রাজশাহী ও দুজন চট্টগ্রামে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, এটি এক দিনে সর্বোচ্চ। গত চার দিন ধরে হামের তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই চার দিনে লক্ষণ নিয়ে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে । ২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয় চারজনের, ৩ এপ্রিল তিনজন, ৪ এপ্রিল চারজন এবং ৫ এপ্রিল ১০ জনের মৃত্যু হয়। গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১৩ জনের। অন্য বিভাগে লক্ষণ নিয়ে মৃত্যু হয়নি। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরীক্ষার মাধ্যমে হামে ১৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহজনক রোগী সারা দেশে ৯৭৪ জন, এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৫৪ জন। ২১ দিনে হাম সন্দেহজনক রোগী সাত হাজার ৬১০ জন। ভর্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৭০ জন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে তিন হাজার ৩৮০ জন। হাম সন্দেহে মৃত্যু ১১৩ জন। হামে মৃত্যু ১৭ জন।
হামের রোগী বেশি ঢাকায়। এরপর রাজশাহী, তারপর চট্টগ্রামে। ২১ দিনে ঢাকায় সন্দেহজনক রোগী তিন হাজার ২৫৯ জন, রাজশাহীতে এক হাজার ৪৮০, চট্টগ্রামে ৯৯৯, খুলনায় ৬৮৩, বরিশালে ৪৫৩, সিলেটে ৩৫৪, রংপুরে ২০৬ এবং ময়মনসিংহে ১৭৬ জন। সন্দেহজনক মৃত্যু রাজশাহীতে বেশি ৫৫ জন। এরপর ঢাকায় ৪০, চট্টগ্রামে ১০, খুলনায় ৬ ও বরিশালে দুজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরীক্ষার মাধ্যমে হামে যে ১৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, তার মধ্যে বরিশাল ও ঢাকায় পাঁচজন করে, চট্টগ্রামে ৩, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে দুজন করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বলেন, ‘মৃতদের বেশিরভাগেই পুষ্টিহীনতা ছিল। অপুষ্টি থাকায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম। সে কারণে হাম তাদের দুর্বল করে ফেলে। দেশে পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। কীভাবে সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পুষ্টিহীনতা দূর করা যায়, সরকার সেদিকেই নজর দিচ্ছে। এটা করতে না পারলে যে কোনো ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পুষ্টিহীন শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। যে ভাইরাল অ্যাটাকই হোক না কেন, পুষ্টিহীন শিশুরা সবার আগে সাফার করবে। শুধু হাম নয়; অন্য কিছু হলেও মারা যাবে।’
৯ মাসের আগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ কেউ এখনো নিশ্চিত নয়। এটা নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই। তবে এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘৯ মাসের আগে আক্রান্তের বিষয়টি আমাদের কাছেও নতুন। একটা প্রাইমারি ইমিউনিটি নিয়েই মানুষ জন্ম নেয়। মায়ের বুকের দুধও খাচ্ছে। পৃথিবীর মধ্যে এখনো শ্রেষ্ঠতম প্রতিরক্ষাকারী হলো মায়ের বুকের দুধ। তারপরও কেন এটা হচ্ছে, এটা আমাদের কাছে কিন্তু নতুন। আরেকটি জিনিস নতুন না, সেটি হলো যদি সময়ে সময়ে কোনো কিছু আউটব্রেক হয়, যেমন হাম ছিল না। আবার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। যক্ষ্মা ছিল না। আবার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এই রোগগুলো বিশেষ ধরনের একটা চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়। আমরা ধারণা করছি, এই চরিত্রটাই এটা কিনা, এই যে ৯ মাসের নিচে কমে আসা। কারণ এটার জেনেটিক ট্রান্সফরমেশনও না।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এত শিশু আগে মারা যায়নি। এ বছরই প্রথম। টিকা না দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। টিকা দেওয়া থাকলে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকত। তখন আর হাম এসব শিশুকে দুর্বল করতে পারত না। ড. ইউনূস সরকারের সময় এগুলোতে খুব ঘাটতি হয়েছে। এগুলোতে কাজ হয়নি। অন্য জিনিস নিয়েই সবাই ব্যস্ত ছিল। তার ফলে এটা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পুষ্টিহীনতাও রয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। জিনিসপত্রের দামের কারণে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। আমাদের বস্তি এলাকায় কি অবস্থা তা এখন জানি না। দাম বৃদ্ধি থাকলে বস্তি এলাকার মানুষের খাওয়া-দাওয়ার ওপর প্রভাব পড়ে।
এখন মৃত্যু রোধ ও হাম প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে সরকার। সে জন্য তড়িঘড়ি করে টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। গতকাল রবিবার থেকে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় হামের টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১২ এপ্রিল থেকে চার সিটি করপোরেশন এবং ৩ মে থেকে দেশের বাকি সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে হামের টিকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া পুষ্টিহীনতায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা শিশুর হামের কারণে নিউমোনিয়া হচ্ছে। মৃত্যু হচ্ছে নিউমোনিয়ায়। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএসএইচআইয়ের শিশু সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের পুনরায় প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে বলেন, হামজনিত নিউমোনিয়া এখনো শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ, যা মোকাবিলায় জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। সে জন্য হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ও শিশুমৃত্যু রোধে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হচ্ছে আইসিডিডিআর,বির উদ্ভাবিত ‘বাবল সিপ্যাপ’। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এ উদ্যোগের কারিগরি অংশীদার হিসেবে আইসিডিডিআর,বি দেশব্যাপী বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি বিনামূল্যে ‘বাবল সিপ্যাপ’ ইউনিট সরবরাহ করছে।
গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় মোট ৬৪ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আইসিডিডিআর,বি। দুটি হাসপাতালে হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় সফলভাবে বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই চলমান উদ্যোগের অংশ হিসেবে, গতকাল ঢাকার মহাখালীতে আইসিডিডিআর,বির সাসাকাওয়া সেমিনারকক্ষে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, পাবনা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরিশাল, বরগুনা এবং কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর জন্য একটি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. মুহাম্মদ যোবায়ের চিশতীর উদ্ভাবিত এই বাবল সিপ্যাপ স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি সাশ্রয়ী অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, যা শিশুদের গুরুতর নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত লো-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপির তুলনায় এটি অধিক কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এবং সীমিত সম্পদের পরিবেশে শিশুর নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যুহার কমাতে এটি আশাব্যঞ্জক সাফল্য দেখিয়েছে। ২০১৩ সালের আগস্ট থেকে আইসিডিডিআর,বির ঢাকা হাসপাতালে তীব্র নিউমোনিয়া ও হাইপোক্সেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপ নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বর্তমানে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নবাবগঞ্জে টিকা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এ এলাকায় যারা আমাদের দলীয় নেতৃবৃন্দ আছেন, সবাইকে আমি অনুরোধ করব গ্রামের দিকে খেয়াল রাখবেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ আমাদের বাচ্চারা যদি হাম আক্রান্ত হয়, সঙ্গে সঙ্গে আপনারা অভিভাবকদের বুঝিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবেন, যাতে করে একটা সন্তানও যেন মৃত্যুর কোলে ঢলে না পড়ে, কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, আপনারা সেদিকে খেয়াল রাখবেন।’