জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদদারি রোধ ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে অভিযান চালিয়ে এক দিনে ৪২ হাজার ৭১০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ মজুদ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ লাখ লিটার।
এদিকে গতকাল রবিবার দুপুরে সচিবালয়ের নিজ মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় মজুদ আছে। পাশাপাশি প্রায় তিন মাসের পেট্রোল ও অকটেন সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেল আমদানির ভালো কিছু উৎস পেয়েছেন বলেও জানান অমিত। তিনি বলেন, ‘আগামী তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
রাশিয়ার তেল আমদানির বিষয়ে স্যাংশন ওয়েভার দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে দেখছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। সরকার আশাবাদী ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়া থেকে বাংলাদেশকে তেল আমদানির সুযোগ দেবে।’
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, ‘তিন মাসের চাহিদা মেটানোর জন্য জ্বালানি তেল সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
কৃষকদের তেল পেতে কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধানে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তেল সরবরাহে কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখাতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার : গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শনিবার সারা দেশে ৩৩৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ৪১ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল এবং ১ হাজার ১০ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া, ১০৭টি মামলা দায়ের করা হয় এবং ২ জনকে ১৪ দিনের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরিচালিত এই অভিযানে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫০ টাকা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানায়, জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন বলেও জানানো হয়।
কোথাও অনিয়ম লক্ষ করা গেলে বা সন্দেহজনক কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পেলে ভিজিলেন্স টিমের নির্ধারিত নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ সাময়িক বন্ধের শঙ্কা : হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তিনটি ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চালানের কারণে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি কাঁচামালের অভাবে সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি বিকল্প রুটে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল দেশে আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি, পরিশোধিত তেলের সরবরাহ যথাযথভাবে নিশ্চিত থাকায় তেলের সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই।
দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে, যেখান থেকে বছরে মেলে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল।
তবে ইরান যুদ্ধের ধাক্কা এসে পড়েছে রাষ্ট্রীয় এই তেল পরিশোধনাগারে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি পার হয়ে কোনো অপরিশোধিত তেলের জাহাজ দেশে পৌঁছায়নি। বর্তমানে ওই কৌশলগত জলপথে তিনটি চালান আটকা পড়ায় কাঁচামাল সংকটে পড়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি। মার্চের শেষে শোধনাগারের মজুদ মাত্র ৩০ হাজার মেট্রিক টনে নেমে এসেছে, যা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় এক সপ্তাহের বেশি সচল রাখা সম্ভব নয়।
জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র মুনীর হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির কাঁচামালে ১০-১২ দিনের একটি গ্যাপ তৈরি হবে। কারণ জাহাজ আসার পর গভীর সমুদ্র থেকে খালাস কার্যক্রম শেষে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছাতে এ সময় লাগবে। এটি আসছে একই উৎস থেকে, কিন্তু ভিন্ন বন্দর ব্যবহার করে। তাই কিছুটা বাড়তি পেমেন্ট দিতে হবে। তবে আমরা চেষ্টা করছি; শিপটি পেলে আর কোনো সমস্যা হবে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি মোট চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ সরবরাহ করে। সুতরাং এটি বড় কোনো কিছু নয়। তবে এই অবস্থায় ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে যতটুকু তেল পাওয়া যায়, তাও গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা হলো, শুধু একমাত্র ইস্টার্ন রিফাইনারির ওপর ভরসা রাখা ঠিক নয়। পরিশোধিত তেলের উৎস বহুমুখী করতে হবে এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে তেল আনার পরিকল্পনা করতে হবে।’