গত বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কাটতে না কাটতেই এবার হামের প্রাদুর্ভাবে আবারও শীর্ষে উঠে এসেছে উপকূলীয় জেলা বরগুনা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে জেলাটিকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এটি কেবল একটি নতুন রোগের বিস্তার নয়; বরং দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জেলায় এখন পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে আসা ১৬৫ জনের মধ্যে ৩৫ জনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে, আরও ৭৫ জনের নমুনা পরীক্ষাধীন রয়েছে। একইসঙ্গে হাম সন্দেহে তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেকেই পরীক্ষা না করিয়ে ঘরেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে জ্বর ও ফুসকুড়িকে সাধারণ রোগ মনে করে অবহেলা করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, সারা দেশেই হামের সংক্রমণ বাড়ছে, তবে বরগুনায় কেন বেশি-এ নিয়ে গবেষণা জরুরি। অনেক অভিভাবক ৯ মাসে প্রথম ডোজ দিলেও ১৫ মাসের দ্বিতীয় ডোজটি দিচ্ছেন না, যা সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হতে পারে। তিনি আরও জানান, অতীতে ভ্যাকসিন সংগ্রহে বিঘ্ন এবং বাজেট ঘাটতির বিষয়টিও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি অনুযায়ী, আগে টিকাদানের কভারেজ ৯০ শতাংশের বেশি ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার পর ১৫ মাসের দ্বিতীয় ডোজ থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ বলেন, অনেক শিশুর অভিভাবক প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ আর দেননি। এর ফলে হামের সংক্রমণ বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে আইইডিসিআর-এর গবেষণা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে উদ্বেগজনকভাবে ৩ থেকে ৪ মাস বয়সী শিশুরাও হাম আক্রান্ত হচ্ছে, যা স্বাভাবিক সংক্রমণ প্যাটার্নের বাইরে। এ প্রসঙ্গে ডা. তারিকুল ইসলাম লিমন বলেন, মাতৃ পুষ্টির ঘাটতি, জন্মের পর শালদুধ না খাওয়ানো এবং শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না থাকাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনে টিকা সূচি নিয়েও নতুন করে ভাবতে হতে পারে। বিস্তর গবেষণার পরই আসলে মূল কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব বলে বলে মনে করে তিনি।
স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বরগুনায় এখনো হামের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, ফলে রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হচ্ছে। এই বিষয়ে বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরপরই আমরা দুটি ১৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করি, পরে আরও শয্যা বাড়ানো হয়েছে। তবে পরীক্ষার সুবিধা না থাকায় নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, এতে সময় লাগছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে এবং আইসোলেশন শয্যাগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে দ্রত শনাক্তকরণ না হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
২০২৫ সালে বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে সরকারি হিসেবে প্রায় ৯ হাজার ৭৪৯ জন আক্রান্ত এবং ১৫ জনের মৃত্যু হলেও বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল। এক বছরের ব্যবধানে একই জেলায় আরেকটি সংক্রামক রোগে শীর্ষে উঠে আসা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে- এটি কি কেবল কাকতালীয়, নাকি এখানে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে?
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, আগে আমাদের ভ্যাকসিনেশন কাভারেজ ৯০ শতাংশের বেশি ছিল। তারপরও হামের প্রভাব বেড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর পর ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হয়েছে। তবে আমরা এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। এই মুহূর্তে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে যাতে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করতে সক্ষম হই।
অনুসন্ধানে সামাজিক বাস্তবতার দিকটিও সামনে এসেছে। উপকূলীয় এই অঞ্চলে দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা এবং কুসংস্কারের প্রভাব রয়েছে। এসব কারণে অনেক পরিবার সময়মতো টিকা নেয় না, রোগ লুকিয়ে রাখে বা চিকিৎসা নিতে দেরি করে। ফলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে জেলায় ১৭টি কেন্দ্রে ২১ দিনের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং আগে টিকা নেওয়া শিশুদেরও এর আওতায় আনা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ বলেন, আমরা ইতোমধ্যে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করেছি এবং হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু করেছি। আশা করছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, শুধু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা জরুরি। আইইডিসিআর'র গবেষণা, টিকাদান ব্যবস্থার কার্যকর নজরদারি, পুষ্টি উন্নয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার না হলে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব বারবার ফিরে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বরগুনার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সংকট নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তাহলে ডেঙ্গুর পর হাম-এভাবে একের পর এক সংক্রামক রোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।