বিদ্যুৎ শিল্প কৃষিতে বহুমুখী বিপর্যয়

গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বড় শিল্পপতি সবার চিন্তা জ্বালানি তেল নিয়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি পেতে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে এখন। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, পরিবহনসহ অন্যান্য খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদামতো জ্বালানি সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। আছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ভয়াবহ চাপ আর উদ্বেগ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি দেশে গরম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

চলমান এই বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতি এখন চাপের মুখে। চ্যালেঞ্জের মুখে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা উসকে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে সরকারিভাবে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র ভিন্নকথা বলছে। পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ সারি, গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ, শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত, কৃষি সেচে ডিজেল নিয়ে দুশ্চিন্তা, বিদ্যুতের লোডশেডিং বৃদ্ধি এবং রেকর্ড দামের পরও এলপিজি বাজারের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা খুব সহজ হবে না। মূলত অতীতের সরকারের ভুলনীতি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকা- এবং কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য দেশের জ্বালানি খাত অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর ও বিদেশি ঋণনির্ভর হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ আরও বেড়েছে। সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে তার পরামর্শ হলো জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া এবং তেলের ব্যবহার কমানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া। যেমন ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, অপচয় রোধ করা ইত্যাদি। পাশাপাশি জোগান ঠিক রাখা। সবকিছুতেই সরকারকে স্বচ্ছ থাকতে হবে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি তো আমাদের সৃষ্টি নয়। ফলে যে কোনো সংকট স্বীকার করা এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়া সরকারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জ্বালানি খাতে আমদানি ও বিদেশ ঋণ নির্ভরতা কমাতে হবে।

‘বর্তমানে জ্বালানি তেলের ঘাটতির পাশাপাশি কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হয়েছে। এর পেছনে মানুষের আস্থার ঘাটতি, সরকারি সংস্থাগুলোর অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবের পাশাপাশি কিছু মানুষের মধ্যে সংকটে মজুদ করার যে প্রবণতা সেটিই মূলত দায়ী,’ যোগ করেন তিনি।

বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং : ইরান যুদ্ধের আঁচ লেগেছে দেশের বিদ্যুৎ খাতেও। মার্চ মাসজুড়ে আবহাওয়া মোটামুটি স্বস্তিদায়ক থাকলেও এ মাসের শুরু থেকেই বাড়তে শুরু করেছে গরম ও বিদ্যুতের চাহিদা। জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। বর্তমানে গড়ে ৮০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন জ্বালানি সংকট বাড়লে দিনে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে। এর ফলে সারা দেশে মানুষকে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত শনিবার বিদ্যুৎ ভবনে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। সেখানে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং বাড়ার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

 দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত আমদানিনির্ভর গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যে কোনো অস্থিরতায় দেশের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তবে উৎপাদন সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মার্চে দেওয়া হয়েছে ৮২-৮৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এপ্রিলে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৯৩ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট।

সরকারের প্রাক্কলন অনুসারে চলতি মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা হবে ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গ্যাস থেকে আসবে ছয় হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট, কয়লা থেকে পাঁচ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েল থেকে তিন হাজার ২১৩ মেগাওয়াট, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৪০ মেগাওয়াট, বায়ু ও সৌর থেকে ২০ মেগাওয়াট, আদানি থেকে এক হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট এবং ভারত সরকার থেকে এক হাজার মেগাওয়াট আমদানি করা হবে।

ছয় হাজার ৮৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চেয়েছে পিডিবি। কিন্তু পেট্রোবাংলা দিনে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দিতে সম্মত হয়েছে। ফলে এ মাসজুড়ে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতেই হবে।

পিডিবির এক কর্মকর্তা জানান, আদানির একটি ইউনিট মেরামতের জন্য গত বুধবার থেকে বন্ধ থাকায় ৬৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে কম আসছে। পাশাপাশি গ্যাস সংকটে চার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ আছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো কম চালানো হচ্ছে। তাই দেশের অনেক এলাকায় দু-একবার লোডশেডিং হচ্ছে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এপ্রিল-মে মাসে যে ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল, আমরা হয়তো তার পুরোটাই পাব না। তবে খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কেনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ঠিক সময়ে দেশে এসে পৌঁছালে ঘাটতির কিছুটা হয়তো পূরণ করা সম্ভব।’

বিদ্যুতের চাহিদা আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করবে বলে মনে করেন পিডিবির কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ‘বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় হয়তো অতটা চাপ পড়বে না।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, এপ্রিলে দেশে একাধিক তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা পৌঁছাতে পারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, ব্যয় বাড়ছে : বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সময় জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর চলছে না শিল্পকারখানায়। এতে করে অনেক সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। আবার লোডশেডিং বাড়লে জ্বালানি তেলের জন্য উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।

গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আকারের অনেক কলকারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বিকল্প হিসাবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। জেনারেটর চালানো এবং পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহনের ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপও কম। এক কথায় বহুমুখী সমস্যার মুখে পড়েছি। সরকার আমাদের নানান আশ্বাস দিচ্ছে; কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন হচ্ছে না।’

‘এতে করে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। কারখানার ব্যয়ও বাড়ছে। আমাদের অর্ডার কমে গেছে। তার্কিতে অর্ডার বেশি হচ্ছে। সহসা এ অবস্থার উন্নতি হবে বলে মনে হচ্ছে না। পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে পড়বে,’ যোগ করেন তিনি।

এই ব্যবসায়ী মনে করেন জ্বালানি তেল নিয়ে এত সংকট হওয়ার কথা নয়। মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।

 পোশাক খাতের মতো টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্টশিল্পের মতো খাতগুলো এখন চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে মাত্র ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি বিল ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে, যা দেশের ভঙ্গুর রিজার্ভের ওপর মরণকামড় দিতে পারে। ইতিমধ্যে গত কয়েক মাসে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে শুধু নারায়ণগঞ্জেই ১৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

কৃষিতেও শঙ্কা : এখন গ্রীষ্মকাল, সেচের মৌসুম। ফসল উৎপাদনের সময়। কৃষকের প্রয়োজন চাহিদামতো সার ও ডিজেল। কিন্তু ডিজেল পেতে নানান ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ধানে ফুল আসার এ সময়ে সেচ না দেওয়ার কারণে পানির ঘাটতি হলে সামনে সংকট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা আছে।

চুয়াডাঙ্গার সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহ বাজারের ইমরান হোসেন জানান, সেচের জন্য ডিজেল পেতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কখনো কখনো দামও বেশি পড়ছে।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, সামনে পাট চাষ করতে হবে। কিন্তু পাম্পে এখনই চাহিদামতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চললে পাটের উৎপাদন ব্যাহত হবে।

সেচযন্ত্রের বড় অংশ চলে ডিজেলে। বাকি অংশ চলে বিদ্যুতে। আবার ধান, গম ও ভুট্টা ক্ষেত থেকে সংগ্রহের জন্য এখন কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। মাড়াইয়ের কাজেও লাগে কৃষিযন্ত্র। এসব যন্ত্র চলে মূলত ডিজেল দিয়ে। কিছু চলে পেট্রোল দিয়ে। কৃষিযন্ত্র পরিচালনাকারীরা প্রয়োজনমতো জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।

কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনমতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচে যেমন সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি ফসল কাটা নিয়েও কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। বোরো মৌসুমের ধান কাটা কিছু দিন পরেই শুরু হবে। তখন প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল না পেলে সংকট তৈরি হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বলছে, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুম। দেশে ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯। এর মধ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি (পাম্প), পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, ফসল মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্র ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র রয়েছে।

ডিএইর হিসাবে, কম্বাইন্ড হারভেস্টর ফসল কেটে মাড়াই করে বস্তায় ভরে দেয়। এর সংখ্যা ১০ হাজার ৭২৬। ফসল মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র আছে চার লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।

ডিএইর হিসাবে, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুমে সেচ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা থাকে সাড়ে ১২ লাখ টনের মতো। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এ সময়টাতে বৃষ্টি হলে সেচের প্রয়োজন কম হয়। দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছে। এতে আলু, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসলের চাষিরা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ধানসহ কিছু ফসলে সেচের চাহিদা কমেছে।

এদিকে সার উৎপাদনে প্রয়োজন হয় প্রাকৃতিক গ্যাসের। সেখানেও গ্যাসের অভাবে কারখানায় উৎপাদন প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরকার সার আমদানির বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হলে কৃষিতে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পণ্য পরিবহন ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী : দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলার প্রভাবে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে পণ্য পরিবহন ব্যয়। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া বিভিন্ন রুটে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, কোথাও কোথাও তা কয়েক হাজার থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে নিত্যপণ্য থেকে শিল্পপণ্য সব খাতেই চাপ তৈরি হয়েছে।

পরিবহন সংকটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী নিজস্ব গাড়ি থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না। ভাড়া গাড়ির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়ার ঊর্ধ্বগতিই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে যেখানে একটি কাভার্ডভ্যানে পণ্য পরিবহনে প্রায় ১৫ হাজার টাকা লাগত, এখন তা বেড়ে ৪৫ থেকে ৪৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে রপ্তানিমুখী পণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

স্থলবন্দরগুলোতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহন ব্যয় গড়ে ৫-৬ হাজার টাকা বেড়েছে। চট্টগ্রামমুখী ১৫ টন পণ্যের ভাড়া ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ৩০-৩১ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রে ভাড়া ১৭ হাজার থেকে বেড়ে ২১ হাজার টাকার বেশি হয়েছে। বেনাপোল বন্দরেও ট্রাকপ্রতি ভাড়া কয়েক হাজার টাকা বেড়ে যাওয়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে।

চালক ও শ্রমিকদের মতে, জ্বালানি নিতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাত্রা যেখানে ৬-৭ ঘণ্টায় সম্পন্ন হতো, এখন তা ১৫-২০ ঘণ্টা, কখনো দুই-তিন দিন পর্যন্ত লাগছে। পাম্পে দীর্ঘ সারি এবং সময়ক্ষেপণের কারণে চালকদের অতিরিক্ত খরচ ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কিছু চালক অভিযোগ করেছেন, জ্বালানি সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মালিকপক্ষ ভাড়া বাড়াচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবহন মালিকরা বলছেন, সময়মতো জ্বালানি না পাওয়াই এই বাড়তি খরচের মূল কারণ।

বিপর্যস্ত গণপরিবহন, চরম ভোগান্তিতে যাত্রী : ডিজেল সরবরাহে ঘাটতির কারণে সড়কে বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেক রুটে বাস চলাচল ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

বিশেষ করে অফিস সময় ও ছুটির ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠছে। বাসস্ট্যান্ডগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক যাত্রী পরিবহন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেকে রিকশা বা রাইড শেয়ারিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। এতে যাতায়াত ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক মালিক বাধ্য হয়ে যানবাহনের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। ডিজেলের অপ্রতুলতা ও ব্যয়বৃদ্ধির ফলে দূরপাল্লার রুটে ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে পাম্পে অপেক্ষা, সীমিত সরবরাহ এবং অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া প্রাইভেট কার ব্যবহার করছেন না। ফলে রাজধানীর সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা কমে গিয়ে যানজটও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

চালক ও গাড়ির মালিকরা বলছেন, তেল নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেক সময় ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল মিলছে না। আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে প্রয়োজন না হলে গাড়ি বের করছেন না। এমনকি জরুরি কাজেও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার এড়িয়ে যাচ্ছেন।

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তথ্যমতে, মার্চ মাসে প্রতিদিন গড়ে ৫৪ হাজার যানবাহন চলাচল করেছে, যা আগের মাসের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার কম। সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে। পাশাপাশি সরকারি যানবাহনের জ্বালানি বরাদ্দ কমানো হয়েছে।