কমছে ইলিশের উৎপাদন

নদী ভরাট ও দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণেই কমে যাচ্ছে ইলিশের উৎপাদন। গত ৮ বছরের মধ্যে ইলিশের উৎপাদন সর্বনিম্নে পৌঁছেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। এ সময়ে ইলিশ উৎপাদন নেমেছে ৫ লাখ টনে। এই অবস্থায় উৎপাদন বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

গতকাল সোমবার ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এসব কথা জানান। আজ থেকে আগামী ১৩ তারিখ পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় জাটকা ইলিশ ধরা, সংরক্ষণ, পরিবহন বিক্রি নিষিদ্ধ। সংবাদ সম্মেলনে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

২০২৫-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টন হয়েছে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দূষণ ও মৎস্য সম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির কারণে ইলিশ মাছ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করবে।

জানা গেছে, এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে ছিল। ওই বছর ইলিশের উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। এরপর ২০২৩-২৪ পর্যন্ত উৎপাদন ৫ লাখ টনের ওপরে থাকলেও গত অর্থবছরে এটা ৫ লাখ টনে নেমে আসে।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের উৎপাদন ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩২ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন।

এক প্রশ্নের উত্তরে আমিন উর রশিদ বলেন, নদীগুলোতে চর পড়ার কারণে ইলিশের উৎপাদন কমে গেছে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে ওই জায়গাগুলো পরিষ্কার করতে হবে। এ জন্য আমাদের নদী এবং খাল খনন কর্মসূচি নেওয়া আছে। আমরা ওই জায়গাগুলো পরিষ্কার করব, যেন ইলিশ ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে।

আমিন উর রশিদ বলেন, জনসাধারণের পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জেলেদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইলিশ মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ। দেশজ জিডিপিতে ইলিশের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে।

ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য তথা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় ৬ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাই ইলিশ সম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষের হাতের নাগালে ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

জ্বালানি তেলের অভাবে সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে জেলেরা যেতে পারছেন না এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে এখন পর্যন্ত মেজর কোনো সমস্যা নেই। জরুরি খাতগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, সরকারের পক্ষ থেকে একটি জেলে পরিবারকে দুই মাসের জন্য ৮০ কেজি চাল, ১২ কেজি আটা, ১০ কেজি তেল, ৮ কেজি ডাল, ৪ কেজি চিনি এবং ১৬ কেজি আলু দেওয়া হয়েছে। একজন জেলে পরিবার প্রায় ৬ হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী পাচ্ছেন। এই প্রথম ৪০ হাজার জেলেকে এ পরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।