জল-স্থল পথের ভাড়ায় পিষ্ট আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য

জ্বালানি সংকটে জল ও স্থল উভয় পথে বাড়তি ভাড়ায় পিষ্ট হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জাহাজ বাড়ার পাশাপাশি সড়কপথে পণ্য পরিবহনেও ভাড়া বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সমুদ্র বাণিজ্যে অয়েল সারচার্জ কিংবা যুদ্ধকালীন চার্জ হিসেবে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে শিপিং কোম্পানিগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও এক মাস অব্যাহত থাকলে এই ভাড়া আরও কয়েকগুণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন শিপিং সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জাহাজ এবং কনটেইনার পরিবহন ভাড়া। যুদ্ধের এই এক মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন রুটের প্রতিটি কনটেইনার পরিবহন ভাড়া ৬০০ থেকে ১ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়িয়েছে মেইন লাইন অপারেটররা। একসময় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের ওয়েবসাইটে বাড়তি ভাড়ার ঘোষণা দিলেও এখন আর সেই ঘোষণা দিচ্ছে না। পণ্যের আনা-নেওয়ার অর্ডার করতে গেলেই বাড়তি ভাড়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছে। পণ্যের ভাড়ার ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)। মূলত এই সংগঠনও ভাড়ার কাজগুলো করে থাকে।

ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট কবীর আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুদ্ধের আগে ইউরোপ রুটে প্রতি কনটেইনার ভাড়া যেখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার, এখন তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে আমেরিকা রুটে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ মার্কিন ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই ভাড়া আরও বাড়বে।’

একসময় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিয়ে ভাড়া বাড়াত। এখন তা হচ্ছে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রাউন নেভিগেশন প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদ ছরওয়ার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে এরই মধ্যে ইরান কয়েকটি শিপিং লাইনকে আক্রমণের হুমকি দিয়ে রেখেছে। সেজন্য ওই কোম্পানিগুলো সুয়েজ খাল রুট বাদ দিয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তর দিয়ে বাড়তি পথ ঘুরে চলাচল করছে। এতে সময়ও ১২ থেকে ১৫ দিন বেশি লাগছে। অন্যদিকে জ্বালানির দামও বেশি। তাই শিপিং কোম্পানিগুলো অয়েল চার্জ কিংবা যুদ্ধকালীন চার্জ নামে বুকিংয়ের সময় বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। আর আগামীতে তা আরও বাড়তে পারে।

সড়কে পণ্য পরিবহনেও বেড়েছে ভাড়া : চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ করে লরি, প্রাইম মুভার, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এসব বাহন চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। এতে অনেক গাড়ি বসে থাকছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২১টি অফডকে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ করে থাকে প্রায় ১ হাজার প্রাইম মুভার। তেল সংকটের কারণে ২৫ শতাংশ গাড়ি এখন কম চলছে বলে জানান অফডকগুলোর সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার। তিনি বলেন, আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আমরা কোনোভাবে সমন্বয় করছি।

তবে সারা দেশে ১৫ হাজার প্রাইম মুভার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি-রপ্তানিকারকের কাছে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ করে থাকে বলে জানান বাংলাদেশ প্রাইম মুভার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাাদক মোহাম্মদ হোসাইন। তিনি বলেন, ‘আমাদের একেকটি গাড়ি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের পেট্রোল পাম্পগুলোতে এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এতে পণ্য পরিবহনে যেমন সময় বেশি লাগছে, তেমনি ভাড়াও বেশি পড়ছে।’

ভাড়া কি আপনারা বেশি নিচ্ছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নিতে যাব কেন? আমদানিকারকরা বেশি ভাড়ায় আমাদের নিচ্ছে। এর কারণ হলো তেলের অভাবের কারণে চাহিদা অনুযায়ী গাড়ি নেই। এখন বেশি ভাড়ায় যদি বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি না নেয়, তাহলে বন্দরে বাড়তি মাশুল দিতে হবে। বাড়তি মাশুলের ভয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে পণ্য নিচ্ছে।

জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৪০ হাজার টাকার প্রাইম মুভার ভাড়া এখন ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ২০ হাজার টাকার ট্রাক ভাড়া দিতে হচ্ছে ৩৬ হাজার টাকা। এ বিষয়ে পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক এম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, একদিকে ট্রাক ভাড়া অন্যদিকে জাহাজের ভাড়া ও কাঁচামালের আমদানিতে বাড়তি দামে আমরা দিশাহারা। আমরা একেবারে পিষ্ট হয়ে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র অপর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, আমদানি পণ্য সবচেয়ে বেশি আমরাই এনে থাকি এবং রপ্তানি পণ্যেও আমরাই শীর্ষে। তাই জাহাজের ভাড়া বাড়লে সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গার্মেন্টস খাত। আবার ট্রাকের ভাড়া বাড়লেও আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ^জুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক মাসে কয়েক দফায় বেড়ে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল ১১৪ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম সরকার এখনো বাড়ায়নি। তারপরও তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে বলে সরকার বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে।