মানবতাবিরোধী অপরাধ

সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১১ এএম

সিরিয়ায় ১৪ বছর ধরে চলা সংঘাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দামেস্কের একটি আদালত আসাদের পাশাপাশি তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদ এবং চাচাতো ভাই সিরিয়ার সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দামেস্কের ফৌজদারি আদালত বাশার আল-আসাদকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আর আতেফ নাজিবকে পরিকল্পিত ‘হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত বলেছে, ২০১১ সালে দারা প্রদেশে বাশার আল-আসাদ সরকারের সংঘটিত অপরাধগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে নাজিবই একমাত্র ব্যক্তি, যার সিরিয়ার ভেতরে সশরীরে বিচার হয়েছে। আদালতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কারাগারের পোশাক পরা নাজিবকে একটি খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অন্য অভিযুক্তদের অনুপস্থিতিতেই তাদের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলতি বছর থেকে সাবেক সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতেই বিচার শুরু করার পর এটি সিরিয়ার আদালতের প্রথম রায়। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আতিফ নাজিব ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা ও নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর মতো অপরাধে জড়িত ছিলেন। এসব অপরাধকে আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১১ সালের মার্চে যে দারা প্রদেশ থেকে তৎকালীন আসাদবিরোধী গণবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল, সেই প্রদেশের ‘পলিটিক্যাল সিকিউরিটি ব্রাঞ্চ’-এর সাবেক প্রধান ছিলেন আতেফ নাজিব। আসাদ সরকারের পতন হলে নাজিবও একপর্যায়ে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তবে পরে দেশে ফিরে আসেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লাতাকিয়া প্রদেশে সাবেক সরকারের অনুগতদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী নাজিবকে গ্রেপ্তার করে। নাজিব সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও, তা আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জানান বিচারক। আদালত মাহের আল-আসাদকে হত্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ, নির্যাতন ও উসকানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসলামপন্থি নেতৃত্বাধীন বাহিনী দামেস্কের দিকে অগ্রসর হলে পরিবারসহ সিরিয়া ছেড়ে মস্কোয় পালিয়ে যান আসাদ ও তার ভাই মাহের।

সিরিয়ায় আরব বসন্তের ঢেউ লাগে ২০১১ সালের মার্চে। দেশটিতে শুরু হয় বাশার আল-আসাদবিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমনে সহিংস উপায় বেছে নেন বাশার। সরকারি দমনপীড়নের মুখে একপর্যায়ে বাশার আল-আসাদবিরোধীরা হাতে অস্ত্র তুলে নেন। শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। আরব বসন্তে পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে স্বৈরশাসকদের পতন ঘটেছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি তার নৃশংস স্বৈরশাসন চালিয়ে যান আরও এক যুগের বেশি। সিরিয়ান অবজারভেটরি অব হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্রোহ থেকে শুরু হওয়া ১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। জীবন বাঁচাতে আরও লাখ লাখ মানুষ প্রতিবেশী লেবানন, জর্ডান, তুরস্ক এবং ইউরোপে পাড়ি জমায়। সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের শাসন শুরু হয়েছিল গত শতকের সত্তরের দশকে। বাশার আল-আসাদের বাবা হাফিজ আল-আসাদের হাত ধরে। হাফিজ আল-আসাদ ১৯৭১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০০ সালে তার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর সিরিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বাশার আল-আসাদ।

এই রায়কে সিরিয়ার নতুন বিচারব্যবস্থা ও অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাশার আল-আসাদ সরকারের আমলে সংঘটিত নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের কতটা জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, সেটিও স্পষ্ট হবে। যুদ্ধের পর প্রতিশ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হওয়ায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের সময় ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি মানুষ জোরপূর্বক নিখোঁজ বা বেআইনিভাবে আটক হয়েছিলেন। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশের জন্য আসাদ সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দামেস্কের আদালতের বাইরে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তারা এই বিচার হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন। পরে অনেক সিরীয়কে রায় উদ্যাপন করতেও দেখা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত