কেন এত ফেল, দায়ী কে

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

গত সোমবার এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ হয়েছে। এতে পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী কেন ফেল করল, এর জন্য কে দায়ী সে প্রশ্ন উঠেছে।

জানা যায়, এসএসসির একই শিক্ষাক্রম, একই সিলেবাস, একই পাবলিক পরীক্ষা। অথচ ফলের ভিন্ন চিত্র। প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফলের পর বিষয়টি সামনে আসে। এসএসসিতে বোর্ড ভেদে প্রশ্নপত্র আলাদা। প্রশ্নপত্রের সামান্য পার্থক্যও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু প্রশ্নপত্রের পার্থক্য দিয়েই বোর্ডভিত্তিক ফলের ব্যবধান ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর পেছনে আরও বেশ কিছু কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল ও এলাকাভেদে আমাদের জীবনমান, অভিভাবকদের সচেতনতা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য স্পষ্ট। একইভাবে দেশের সব অঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ এক নয়। রাজধানী ও বড় শহরগুলোর অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, ল্যাব, লাইব্রেরি, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং অতিরিক্ত অ্যাকাডেমিক সহায়তা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে প্রত্যন্ত এলাকার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

গত সোমবার প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ ৭১.৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। সর্বনিম্ন পাসের তালিকায় রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ড ৫৭.৩৯। উভয় বোর্ডের ফলের পার্থক্য ১৪.৩৯ শতাংশ। একইভাবে এবার ঢাকা বোর্ড থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৫৩ জন, সবচেয়ে কম পেয়েছে বরিশাল বোর্ড, ২ হাজার ৭৭৮ জন। ঢাকা থেকে বরিশাল বোর্ডে ৩০ হাজার ৪৭৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ কম পেয়েছে। অপরদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে; যা আরও ভয়াবহ পার্থক্যের জানান দিচ্ছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা বোর্ডের সাফল্য বেশি হওয়ার প্রধান কারণ হলো এখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্কুলগুলোর অবস্থান ও প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ-সুবিধা বেশি। ঢাকার অভিভাবকরা অনেক বেশি সচেতন। আর ময়মনসিংহ বোর্ড হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত। ময়মনসিংহ শহর ও অন্যান্য জেলা শহর বাদ দিলে বেশির ভাগ এলাকাতেই স্কুলগুলোর শোচনীয় অবস্থা। অপরদিকে সিলেটের মানুষের আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পড়াশোনার চেয়ে বিদেশযাত্রাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এখানকার মানুষ পড়াশোনার পেছনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী না হয়ে বিদেশ পাঠাতে ছেলেমেয়েদের পেছনে বিনিয়োগ করেন।

অন্যদিকে আর্থিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে থাকলেও রংপুরের মানুষ পড়াশোনায় গুরুত্ব দেয়। ফলে এই অঞ্চলে শিক্ষার হার বাড়ছে। এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা বেশি। এদিকে আমাদের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্ন চলছে তার কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। তাছাড়া এই দুই বোর্ডের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর।

এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, আমাদের জাতীয় জীবনেও অঞ্চলভিত্তিক ফারাক স্পষ্ট। আর এটা একদিনে হয়নি। ঢাকার শিক্ষার্থীরা যে মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক পায় তা অন্য কোথাও নেই। বছরের পর বছর কয়েকটি বোর্ড ভালো ফল করে আসছে। ফলে এসব বোর্ডের অধীনে মানসম্মত শিক্ষক পাওয়া যায়, অন্যদিকে পিছিয়ে থাকা বোর্ডের শিক্ষকরা কিছুটা মানের দিক থেকে পিছিয়ে থাকবেন। ভিন্ন প্রশ্নপত্র পার্থক্য গড়ে দেয় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আগামী বছর থেকে অভিন্ন প্রশ্নে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করছে সরকার।

কেন বরিশাল ফলে ঢাকার চেয়ে পিছিয়ে এমন প্রশ্নের জবাবে বরিশাল বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে বরাবরই আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের মানসম্মত স্কুলের সংখ্যা ঢাকার তুলনায় সামান্য, স্কুলে ভালো ল্যাব নেই, সরঞ্জাম নেই, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষকও নেই।

ফলের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও। তিনি বললেন, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ফলই এসেছে, তাহলে এত ফেল কেন? দেশে পাসের হারের তুলনায় শিক্ষার মান নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন যে ফল হয়েছে, সেটিকে আমাদের বর্তমান ব্যবস্থার বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে হবে। বর্তমান মানদ-ে যে ফল হওয়ার কথা ছিল, সেটিই হয়েছে। কিন্তু এটাকে তো বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য মান বলা যাবে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানে পৌঁছানো। সেজন্য শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের পারফরমেন্স থেকে ফল তৈরি করতে হবে, সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা থেকে নয়।

ফেল করা এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী : এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে এমন প্রশ্নে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কেরানি বানানোর শিক্ষায় আটকে আছে। শিক্ষার্থীদের রাত জেগে মুখস্থ করানোর কারণে প্রতিভা নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ৫-৬টি বিষয় পড়ানো হয়, সেখানে এসএসসিতে পড়তে হয় দশের বেশি বিষয় নিয়ে। অকৃতকার্যদের মধ্যে যারা মানোন্নয়ন দিতে চায়, তাদের দ্রুত সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা বিপদগ্রস্ত না হয়। এটি স্কুলভিত্তিক হলেই যথেষ্ট। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে, একটি বিষয়ে ফেল করেছে বলে তার শিক্ষাজীবন থেমে যাবে না। তিন মাসের মধ্যে এসব শিক্ষার্থীকে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া উচিত।

শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার দায় আছে উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া শিক্ষকদের দায়িত্ব। কোনো শিক্ষার্থী কেন পিছিয়ে পড়ল, তার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এই ব্যর্থতার দায় কেবল কোনো এক শিশুর ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না, এর সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থারও দায় থাকে। পরীক্ষা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের চূড়ান্ত পরিমাপক নয় উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ফল আশানুরূপ না হওয়া অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার।

ব্যবস্থা নেওয়া হবে ৩১২ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে : একজনও পাস করেনি এমন ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে শিক্ষা প্রশাসন। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক সক্ষমতা, শিক্ষক সংকট, নিয়মিত পাঠদান খতিয়ে দেখার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ তদারকি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অতিরিক্ত অ্যাকাডেমিক সহায়তা এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এদিকে শূন্য পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, এমপিওর সব সুবিধা নেবে অথচ একজন শিক্ষার্থীও পাস করবে না, তা হতে দেওয়া যায় না। একই সঙ্গে যত্রতত্র আর কোনো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেন জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত