বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দেড় বছরেরও বেশি সময় পর তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তিনি এতদিন কোথায় ছিলেন এবং মঙ্গলবার কীভাবে পুলিশের কাছে ধরা পড়লেন এ নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গতকাল বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছে বিবিসি নিউজ বাংলা।
গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর নেওয়া হয় ঢাকার মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি কার্যালয়ে। ঢাকা ও রংপুরে জুলাইয়ের একাধিক হত্যা মামলায় তার নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় স্পিকার পদ থেকে শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ান বলে জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এরপর গত দেড় বছরে তাকে আর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানান গুঞ্জন শোনা গেছে।
গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেপ্তারও হন অনেকে। জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সে সময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন।
তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
‘মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে ও আইনবহির্ভূত হত্যাকা- থেকে জীবন রক্ষা করতেই’ তাদের সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রাথমিকভাবে সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও বছরখানেকের মাথায় গত বছরের ২২ মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতার সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল। সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সপরিবারে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেনানিবাসে থাকা অবস্থাতেই ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে ধারণা করা হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কীভাবে তিনি সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, সেটির একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি জবানবন্দিতে।
গত বছরের এপ্রিলে পলক আদালতকে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে ‘লুকিয়ে ছিলেন’। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান বলে জানান পলক। কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে তিনি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখন পাওয়া যায়নি।
তিনি কতদিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
প্রায় দেড় বছর পর ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে’ গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে শিরীন শারমিন গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় ‘আত্মগোপনে ছিলেন’ শিরীন শারমিন চৌধুরী।
‘তিনি বলছেন, এতদিন দেশেই ছিলেন। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটা তার স্বামীর নামে বলে জানতে পেরেছি। ধরা পড়ার আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে’ বিবিসি বাংলাকে বলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম।