শম্পাকে না পেলে মরে যাব

রুবেল কথায় কথায় বলত, ‘শম্পারে না পাইলে বাঁচমু না দোস্ত’। তখন কেবল ক্লাস এইটে উঠেছি আমরা। মনে প্রেম প্রেম ভাব। শম্পাকে ভালো লেগে গেল রুবেলের। শম্পার বাবা ছিলেন মস্ত বড় ডাক্তার। সরকারি চাকরির সুবাদে আমাদের মফস্বলে এসেছিলেন। সেই আমলে শম্পা স্কুলে, কোচিংয়ে আসা-যাওয়া করত গাড়িতে।

আর রুবেলের বাবার ছিল মুদি দোকান। তবু রুবেল মনে মনে শম্পাকে ভালোবাসত। কিন্তু শম্পাকে বলতে পারত না। বলার সুযোগও তেমন ছিল না তখন।

আমরা দানিয়েল স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তে যেতাম। স্যার আমাদের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন কিন্তু তার কাছে শহরের সব স্কুলের ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট পড়তে আসত। মেয়েদের একটাই ব্যাচ ছিল, দুপুর তিনটায় শুরু হতো, চারটায় শেষ। আর আমাদের ব্যাচ ছিল তারপরে, চারটা থেকে পাঁচটা। আমরা সব আগে গিয়ে উপস্থিত হতাম, যাতে মেয়েরা বের হওয়ার সময় ওদের দেখতে পারি। শম্পাকে সেখানে প্রথম দেখে রুবেল।

আমার নিজের সাইকেল ছিল না। রুবেলের বাবার একটা সাইকেল ছিল। রুবেল সেটা চালিয়ে স্কুলে যেত, প্রাইভেট পড়তে যেত। রুবেল সাইকেল চালাত, আমি ওর সাইকেলের পেছনে চড়ে সারা শহর ঘুরে বেড়াতাম। রুবেল সাড়ে তিনটার সময় আমার বাসার সামনে আসত। পৌনে চারটার মধ্যে আমরা দানিয়েল স্যারের বাসার সামনে পৌঁছে যেতাম। স্যারের বাসার সামনে শম্পার গাড়ি পার্ক করা থাকত। সেটা দেখে আমরা বুঝে নিতাম, শম্পা ভেতরে আছে। শম্পাদের গাড়ির নাম্বার পর্যন্ত রুবেল মুখস্থ করে ফেলেছিল।

কোচিং শেষে মেয়েরা একেক করে বের হতো। তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য শম্পাকে দেখতে পেত রুবেল। দেখতে দেখতেই প্রেম। সে যখন মেয়েটার প্রেমে পড়ে তখন নামটা পর্যন্ত জানত না। শুধু বলত, ‘ফর্সা মেয়েটা, লম্বা চুল।’

কিন্তু এভাবে কতদিন? রুবেল নিজে মেয়েটার একটা নাম দিয়ে দেওয়ার আগে আমাদের বন্ধু অরুপ খোঁজ আনল, মেয়েটার নাম শম্পা, ওর বাবা ডাক্তার। অরুপ এই খবর এনেছিল মেয়েদের ব্যাচের একটা মেয়ের কাছ থেকে। আমাদের মধ্যে একমাত্র অরুপ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে পারত। ওর ভয় লাগত না, হাত-পা কাঁপত না, কথা জড়িয়ে যেত না। গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারত। মেয়েরাও ওকে পছন্দ করত। আমরা যেখানে শুধু দূর থেকে মেয়েদের দেখতাম, সেখানে অরুপ গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে আসত।

অরুপ শুধু শম্পার খবর আনেনি, সঙ্গে রুবেলকে দিয়েছিল একটি উপদেশ, ‘এই মাইয়ার লেভেল আলাদা, মামা।’

শম্পারা যে বড়লোক সেটা তো গাড়ি দেখে আমরা বুঝেছিলাম। কিন্তু ‘আলাদা লেভেল’ বলতে অরুপ আসলে বুঝিয়েছিল রুবেলের ধরাছোঁয়ার বাইরের এক জগতের বাসিন্দা শম্পা। সেটা অবশ্য বোঝার মতো ম্যাচুইরিটি রুবেলের ছিল না।

আর ততদিনে রুবেল ‘কাহো না প্যায়ার হ্যায়’ দেখে ফেলেছে। নিজেকে ঋত্বিক ভাবতে শুরু করেছে। ঋত্বিকের মতো হেয়ারস্টাইল করেছে, ক্যাপ-সানগ্লাস পরে ঘুরে বেড়াত। ঋত্বিকের মতো জামা-কাপড় পরা শুরু করল।

পেপার থেকে আমিশা প্যাটেলের একটা ছবি কেটে নিজের পকেটে রেখে দিয়েছিল। রুবেল বলত, আমিশা প্যাটেলের চেহারার সঙ্গে নাকি শম্পার চেহারার মিল আছে। শম্পার ছবি না পেয়ে তাই সে আমিশার ছবি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। বিফোর ইউ চ্যানেলে সারাক্ষণ বাজত, ‘এক পাল কা জিনা, ফিরতো হ্যায় যানা..’। রুবেল মাঝে মাঝে সাইকেল চালাতে চালাতে গেয়ে উঠত গানটা।

কিন্তু শম্পার মধ্যে নিজেকে আমিশা প্যাটেল ভাবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। রুবেল তবু বলত, ‘দোস্ত, শম্পাকে না পেলে মরে যাব।’ আমরা হাসতাম। বলতাম, ‘শম্পাকে গিয়ে বল।’ রুবেল বলত, ‘বলব। আগে তোদের সঙ্গে বলে প্র্যাকটিস করে নিই। শম্পাকে দেখলে আমি সব কথা ভুলে যাই।’

রুবেল ততদিন মনে মনে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। শম্পাকে বলতে না পারলেও বাকি সবাইকে সে শম্পার কথা বলে ফেলেছে। যেমন, চুল কাটতে গিয়ে নাপিত সঞ্জয়দাকে বলল, ‘চুলটা ঋত্বিকের মতো করে কেটে দাও সঞ্জয় দা। শম্পা যদি পছন্দ না করে তাহলে ন্যাড়া হয়ে যাব।’

সঞ্জয়ও মজা নিত, বলত, ‘তাহলে তোমার শম্পাকেই নিয়ে আসো। ও যেমনভাবে বলবে তেমনভাবে কেটে দিব।’ এ কথা শুনে রুবেল লজ্জা পেত আবার খুশি হতো। এটাকে সে তার প্রেমের সামাজিক স্বীকৃতি মনে করত। সে ভাবত নাপিত সঞ্জয় পর্যন্ত চাইছে, শম্পা ঠিক করে দিক রুবেলের হেয়ারস্টাইল। আর রুবেল চাইত শম্পা তার জীবনটা ঠিক করে দিক।

শম্পা, শম্পা করতে করতে রুবেলের আর পড়ালেখা হলো না। আমরা এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। রুবেল পেল থ্রি পয়েন্ট টু ফাইভ। শম্পা পেল জিপিএ ফাইভ। শম্পার অবশ্য জিপিএ ফাইভ ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ সে প্রেমে পড়েছিল সাদা এপ্রোনের। বাবার মতো সেও ডাক্তার হবে, ঢাকা মেডিকেলে পড়বে। আর রুবেলের বাবা চাইত তার ছেলে দোকানে বসুক। ব্যবসা বুঝে নিক। রুবেলের রেজাল্ট নিয়ে তাই তার কোনো আফসোস ছিল না। তিনি সেদিন হাসিমুখে মিষ্টি বিতরণ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এক চান্সে পাস করছে এই বেশি। দোকানদারি করতে এত বিদ্যা লাগে না, বুদ্ধি থাকলেই হয়।’

২.

আমরা কলেজে ভর্তি হলাম। রুবেল তার বাবার কথামতো দোকানে বসা শুরু করল। ততদিনে সিগারেট ধরে ফেলেছি। রুবেল দোকানে বসত সিগারেট আর নগদ টাকা সরানোর জন্য। কলেজ থেকে বাসায় গিয়ে খেয়ে, গোসল করে এসে দুপুরে দোকানে বসত রুবেল। কাকা চলে যেতেন বাসায়। খেয়ে, ঘুমিয়ে বিকেলে আসতেন। তখন রুবেলের ছুটি হতো। রুবেল সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। আমি আর রুবেল সাইকেলে করে নদীর পাড়ে চলে যেতাম, সিগারেট টানতাম, গল্প করতাম। তারপর মিন্ট চকলেট মুখে দিয়ে বাড়ির পথ ধরতাম।

শম্পা ততদিনে ঢাকায় গিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে। শম্পার চলে যাওয়া রুবেলকে কষ্ট দেয় কিন্তু সে কাউকে কিছু বলে না। রুবেল হয়তো বুঝে গেছে, তাকে দিয়ে আর পড়ালেখা হবে না। পড়ালেখায় তার মন নেই। কলেজে সে ভর্তি হয়েছে শুধুমাত্র বন্ধুদের জন্য। বন্ধুরা সবাই ভর্তি হয়েছে তাই সেও ভর্তি হয়েছে, সবাই যায় পড়তে আর সে যায় আড্ডা দিতে।

আমাদের প্রেম বিশেষজ্ঞ বন্ধু অরুপও ঢাকায় চলে গিয়েছে। সে আর বয়েজ কলেজে পড়তে চায় না। ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে পড়ে এমন এক কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়েছে সে। বাসায় কথা বলার জন্য বাবা-মা একটা ফোন কিনে দিয়েছে তাকে। মটোরোলা সি ওয়ান ওয়ান থ্রি মডেলের সেই সেটে শুধু মেয়েদের নাম্বার সেভ করা।

আমি আর রুবেল থেকে গেলাম মফস্বলের বয়েজ কলেজে। শম্পার শোক কাটিয়ে উঠতে রুবেল আবার মনে মনে ভালোবাসতে শুরু করল। এবার আর অন্য লেভেলের কেউ নয়। আমাদেরই গলির মেয়ে পপি। হঠাৎই যেন বড় হয়ে গেছে মেয়েটা। বাড়ির আশপাশে থাকলেও এতদিন তাকে খেয়াল করেনি রুবেল। এবার সে তার মনের শূন্যস্থানে পপিকে জায়গা দিল। তবে যেহেতু এক গলিতে থাকি, এই কথা রুবেল সবাইকে বলতে পারল না। বলল শুধু আমাকে, ‘পপিকে ছাড়া বাঁচব না দোস্ত।’ আমি বললাম, ‘শম্পাকে ছাড়া তো দিব্যি বেঁচে আছিস।’ রুবেল চুপ হয়ে যায়। তার ভালোবাসা যে খাঁটি সেটা সে বোঝাতে পারে না।

শম্পার সঙ্গে সঙ্গে ঋত্বিকও চলে গেছে রুবেলের জীবন থেকে। ততদিন সে ‘তেরে নাম’ দেখে সালমান খানের ফ্যান বনে গেছে। রুবেল নামে আরও দুজন ছিল আমাদের ক্লাসে। তাই রুবেল নিজের নামের আগে ‘রাধে’ টাইটেল বসিয়ে নিল। ওর নাম হয়ে গেল ‘রাধে রুবেল’। আস্তে আস্তে ওর রুবেল নামটা মুছে গেল, কলেজে সবাই ওকে ‘রাধে’ নামে ডাকতে শুরু করল। রুবেল হয়ে উঠল ‘রাধে ভাই’।

আমি ভেবেছিলাম এবার পপিকে গিয়ে রুবেল বলতে পারবে, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।’ বিকেলবেলা আমাকে না নিয়ে পপিকে নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরতে যাবে। পপির কথায় সিগারেট ছেড়ে দেবে। কিন্তু এর কিছুই হলো না। কারণ রুবেল বলার আগে সোহেল বলে ফেলেছে পপিকে, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।’ সোহেল আমাদের এলাকার ছোট ভাই। পপির সমবয়সী। সোহেল যেখানে পপিকে প্রপোজ করেছে আর পপিও রাজি সেখানে রুবেলের জীবন আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

৩.

শম্পা আর পপিকে হারিয়ে রুবেল পেল পারভেজ ভাইকে। আমাদের কলেজের দাপুটে ছাত্রনেতা। পারভেজ ভাইয়ের সঙ্গে থেকে রুবেল খুঁজে পেল তার নতুন ভালোবাসা, রাজনীতি। এরপর রুবেলের জীবনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আমার আর তেমন বিশেষ জানা নেই।

কারণ এইচএসসি পাস করে আমি ঢাকায় চলে আসি, ভার্সিটিতে ভর্তি হই, নতুন বন্ধুবান্ধব, নতুন জগতের সঙ্গে পরিচিত হই। ধীরে ধীরে আমার বন্ধু রুবেল আমার জীবন থেকে ফেইড আউট হতে থাকে। রুবেলের সঙ্গে দেখা হতো বাড়ি ফিরলে। আমি চলে যেতাম ওদের বাসায় বা দোকানে। অথবা খবর পেলে ও চলে আসত আমাদের বাসায়। কিন্তু ততদিনে রুবেল খুব ব্যস্ত হয়ে গেছে।

রুবেলের পার্টি তখন বিরোধী দলে। তারপরও ওর ভীষণ ব্যস্ততা। পারভেজ ভাই বলেছেন, বিরোধী দলে থাকার সময় আসল রাজনীতি করতে হয়। দলের ত্যাগী নেতারা তৈরি হয় বিরোধী দল করে। তাই রুবেলও ভাইয়ের সঙ্গে জমিয়ে রাজনীতি করতে থাকল। দুই গুরু-শিষ্যের কথা তখন আমাদের মফস্বলে বেশ ছড়িয়ে গেছে। দল ক্ষমতায় এলে এরা দুজন অনেকদূর যাবে বলে শোনা যায়। বিরোধী দলে থাকলেও রুবেলের বেশ ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা রয়েছে তরুণদের মধ্যে। সবসময় তার সঙ্গে কেউ না কেউ থাকে।

একবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছি। রুবেলকে পাচ্ছি না। দোকানে গেলাম, নেই। ফোন দিলাম, বলল বিকেলে এসে দেখা করবে। এলো সন্ধ্যায়, সঙ্গে তিনটা মোটরসাইকেল, সব ওর ছোট ভাই। বাসার সামনে এসে আমাকে ডাক দিল, আমি নিচে নেমে এলাম। বসে পড়লাম রুবেলের বাইকের পেছনে।

বাইক ছুটিয়ে রুবেল চলল নদীর পাড়। আমাদের আড্ডার জায়গা। নদীর পাড়ে গিয়ে সিগারেট টানতে টানতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিরোধী দলের রাজনীতি করে কাউকে এত ব্যস্ত থাকতে আমি দেখিনি। কী করিস সারা দিন?’

রুবেল বলল, ‘নেতাকর্মীদের সময় দেওয়াই মূল কাজ। আন্দোলন, হামলা-মামলা থেকে নেতাকর্মীদের বাঁচানো। অনেক ঝামেলা দোস্ত।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘পারভেজ ভাই শুনলাম এমপি ইলেকশন করবে।’

রুবেল বলল, ‘করতে তো চায়। এমপি না হলেও মেয়র ইলেকশন করবে। সেইভাবে কাজ করতেছি।’

রুবেলকে বললাম, ‘যাক। একটা জিনিসে তুই তাহলে সেটল হতে পারলি।’

রুবেল বলল, ‘সবই পারভেজ ভাইয়ের জন্য। ভাই না থাকলে আমি কিছু হতে পারতাম না। ভাইয়ের জন্য জান দিয়া দিমু ব্যাটা।’

এই কথা শুনে আমি হেসে দিলাম। বললাম, ‘তুই আর জান দিস না দোস্ত। তোর জান তোর কাছে রাখ। তুই যার জন্য জান দিতে যাস, সেই তোরে ছাইড়া চইলা যায়।’ রুবেল হাসে কথা শুনে।

আমাদের সিগারেট শেষ হয়। রুবেলের বাইকের পেছনে বসে ফিরতে ফিরতে ভাবি রুবেলের জীবন থেকে শম্পা, পপি চলে গেছে। আমিও চলে যাওয়ার মতো। রয়ে গেছে পারভেজ ভাই। আর রয়ে গেছে আমার বন্ধুর জীবন দেওয়ার প্রবণতা। যাকে ভালোবাসে তার জন্য সে জীবন দিতে পারে। রুবেলের জীবন যেন শুধু অন্যের জন্য। 