ঢাকার বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। কারণ হিসেবে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ভোজ্যতেলের সরবরাহ একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে। এমন এক সময়ে এই সরবরাহ সংকুচিত করা হয়েছে যখন সরকারের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এবং এ নিয়ে আলোচনা চলমান।
জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে ভোজ্যতেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। যা আজ থেকেই কার্যকর করার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযোগ রয়েছে, দাম না বাড়ালে বাজারে সরবরাহ আর স্বাভাবিক করবে না বলে খুচরা দোকানিদের জানানো হয়েছে সরবরাহকারীদের পক্ষ থেকে।
যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী রবিবার তেলের দামের বিষয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। এর আগে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দামের বিশ্লেষণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমান দামেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যে কারণে তেলের দাম বাড়ানোর দরকার নেই।
এদিকে সরবরাহকারীরা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। যা বর্তমানে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ টাকায়। এ ছাড়া ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানা গেছে, সরবরাহ সংকটের বিষয়টি অবশ্য গত ৭ এপ্রিল বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কারওয়ানবাজার ও শান্তিনগর বাজারে সরেজমিন পরিদর্শনেও দেখতে পেয়েছেন। এ সময় খোলা সয়াবিনের বাড়তি দাম, বোতলজাত তেলের সরবরাহ ঘাটতি এবং খুচরা বিক্রেতাদের তেলের সঙ্গে অন্য পণ্য নেওয়ার চাপের অভিযোগ পান মন্ত্রী। তিনি অবশ্য দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা জানিয়েছেন বিক্রেতাদের।
গতকাল ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এ প্রক্রিয়া ভোক্তাকে জিম্মি করে তারা তেলের দাম বাড়ানোর কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে বলে অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেছেন।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার মুদি দোকানিরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে ৫ লিটার সয়াবিন তেলের কয়েকটি বোতল থাকলেও এক ও দুই লিটারের বোতলের মজুদ নেই। যে কারণে ভোক্তারাও বিড়ম্বনায় পড়েছেন। এই বাজারে তেল কিনতে এসে বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ৫ থেকে ৬টি দোকান ঘুরে এক বা দুই লিটারের সয়াবিন তেল পাননি তিনি।
ওই বাজারে মাহিন জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা ফারুক হোসেন বলেন, কোম্পানিগুলো এখন সয়াবিন তেলের অর্ডার নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। একই বাজরের আল্লাহর দান স্টোরে দোকানি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গত প্রায় চার দিন ধরেই তেল নেই। তিনি জানান, কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানিয়েছেন নতুন দাম নির্ধারণের আগে কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ করবে না। যারা দোকানে অর্ডার নেওয়ার জন্য আসছেন, তারা তেল ছাড়া সব পণ্যের অর্ডার নিচ্ছেন। একই চিত্র পাওয়া গেছে রামপুরা, বাড্ডাসহ কয়েকটি এলাকার দোকানগুলোতে।
এদিকে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকটের কারণে বেড়ে গেছে খোলা তেলের দামও। সেটা অবশ্য গত রোজার মাস থেকেই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত দামে। এ ছাড়া খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়। যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তসলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে এবং বাজারে কয়েক মাস ধরে লোকসান গুনছে। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১১শ ডলার ছিল তখন দাম সমন্বয় হয়েছে। এখন দাম দাম ১ হাজার ৩৭০ ডলার হয়েছে। এই যে বাড়তি দাম- এটা তো সমন্বয় করতে হবে। কোম্পানিগুলো কতদিন এভাবে লোকসানে পণ্য বিক্রি করবে? কারণ প্রতি লিটার তেলে কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন সময়ে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে।
তিনি জানান, দাম সমন্বয়ের জটিলতায় ব্যবসা থেকে বেরিয়ে গেছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। নতুন করে কেউ এই ব্যবসায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, একটি বড় গ্রুপ, যারা তেলের ব্যবসায় প্রথম সারিতে ছিল, তারা ব্যবসা ছোট করে এনেছেন। কারণ তারা ব্যবসা করতে পারছেন না। তিনি সরকারের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।