হরিজন পল্লীতে শিক্ষার নতুন আলো

চৈত্রের আকাশের ঘন কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে পশ্চিম আকাশে উঁকি দিচ্ছে সূর্য। মেঘের মৃদু গর্জন আর দমকা হাওয়ায় মনে হচ্ছে এই বুঝি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হয়, শুরু হয় কালবৈশাখী। এমন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হরিজন পল্লীর গৃহবধূরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন রোদে শুকানো কাপড় ঘরে তুলতে। এরই মাঝে পাড়ার গলির মধ্য থেকে এক কিশোরের কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘এ সাদেক ভাই আইছে রে, সাদেক ভাই আইছে...।’

হাফপ্যান্ট পরা কিশোর এক ঘর থেকে আরেক ঘরে দৌড়ে ছুটে চলে। মুখে তার ওই এক হাঁক ‘সাদেক ভাই আইছে রে’। হাঁটা শুরু করা গেল তার পেছনে পেছনে। কিছুদূর পথ আগানোর পর দেখা গেল সে ঝাঁকড়া চুলের এক যুবককে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘আজ এত দেরি হলো যে।’ আলাপচারিতা দেখেই বোঝা গেল, তিনিই সাদেক। আর যে কিশোরকে জড়িয়ে ধরে আছেন সাদেক, সে সিদ্ধার্থ।’

সিদ্ধার্থের গলা ফাটানো ডাকের পর তার পেছনেই দলবেঁধে একদল শিশু-কিশোর ছুটে আসে। তাদের হাতে বই, খাতা, স্কুলব্যাগ, ফুটবলসহ নানা খেলা ও শিক্ষাসামগ্রী। তারা তালা খুলে ঢুকে পড়ে হরিজন পল্লীর ক্লাব ভবনে। মেয়ে শিশুরা শুরু করে ক্লাব ভবন ঝাড়– দেওয়া। আর বাকিরা ফুটবল নিয়ে নেমে পড়ে সামনের মাঠে।

টানা ১০ মিনিট চলে ফুটবল খেলা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাদেক নিজেও। স্বল্প সময়ের খেলা শেষে আবার তারা ক্লাব ভবনে ফিরে আসেন। শুরুতেই তাদের সঙ্গে নিয়ে দুটি ইনডোর খেলা আয়োজন করেন সাদেক। এরপরে শুরু হয় পড়াশোনার পালা।

উপস্থিত শিশু-কিশোর প্রায় ৩০ জন। আর শিক্ষক আছেন সাদেকসহ ৬ জন। কেউ ক্লাসের বইয়ের পড়া বুঝে নিচ্ছে, কেউ পড়ছে আদর্শলিপি, আবার কেউবা শিখছে আঁকা। হরিজন পল্লীর ক্লাব ভবনটি প্রতিদিন বিকেলে হয়ে ওঠে শিশুদের পাঠশালা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব-উত্তর কোনের বুধপাড়ার গনির দালান এলাকায় দেড় শতাধিক পরিবার নিয়ে এই হরিজন পল্লী। পাড়াটিতে প্রায় ৬০০ লোকের বসবাস। পল্লীর কর্মজীবী সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও একাডেমিক ভবনে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এই পাড়ার শিশুরা পরিকল্পিত উদ্যোগ ও পরিবেশের অভাবে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার আলো থেকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বংশানুক্রমিকভাবেই জড়িয়ে পড়েন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সুইপার পেশায়। এই পাড়াটি গড়ে ওঠার পর থেকে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে এভাবেই চলছে।

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রধান কারণ পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা। আবার কারও বেলায় নিজেরা লেখাপড়া না জানায় সন্তানদের পড়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ না থাকা। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-ির মধ্যে থেকেও তাদের সন্তানরা শিক্ষার ছোঁয়া পায় না। এ যেন প্রদীপের মাঝের এক অন্ধকার।

পল্লীর বাসিন্দা জয় সাহা অস্থায়ীভাবে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে। তার মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার মতো। নিজের বেতনের টাকায় দুই সন্তান ও পিতা-মাতাসহ ৬ সদস্যের পরিবার চালানোর সম্ভব হয় না। বাচ্চাদের পড়ালেখার ব্যাপারে নজর দেওয়ারও সুযোগ ছিল না।

এই পল্লীর শিশু-কিশোরদের শিক্ষা-সহায়তা দিতেই এগিয়ে এসেছেন সাদেক। তার সঙ্গে রয়েছেন ফুয়াদ রাতুল, তাসনিয়া আমিনসহ আরও প্রায় ১০ জন। তারা সবাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে ‘সেতু’ নাম দিয়ে শুরু হয়েছে এই শিক্ষা কার্যক্রম। সাড়া পেয়েছেন ব্যাপক।

শিক্ষার্থীদের ক্লাস কার্যক্রম শুরু হয় বিকেল ৪টার পরে। কিশোর সিদ্ধার্থ বিকেল হলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকে কখন তার শিক্ষকরা আসবেন। শিক্ষকদের আসতে দেখলেই সে দৌড়ে চলে যায় পল্লীর গলিতে গলিতে। সবাইকে ডেকে নিয়ে পড়তে বসাই যেন তার কাজ। সিদ্ধার্থ জানায়, ডাকতে গেলে বন্ধুরা তার সঙ্গেই চলে আসে। তারা কেউ একটুও দেরি করে না।

নিয়মিত এখানে পড়তে আসে ক্লাস ওয়ানে পড়–য়া আরণ্য। সে জানায়, পড়ার আগে খেলাধুলা হয়। ক্লাস শেষেও খেলাধুলা হয়। এ ছাড়া এখানে গান ও নাটকের অভিনয়ও চলে।

এই স্কুল চালুর পরে পল্লীর শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে জানান সেখানের বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খালেদা জিয়া হলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী লিপি। তিনি বলেন, সারাদিনের কাজের শেষে বাচ্চাদের সময় দেওয়া আমাদের সমস্যা হয়ে যায়। এই স্কুল চালু হওয়ার পরে আমার দুই বাচ্চার লেখাপড়ায় আগ্রহ অনেক বেড়েছে।

সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে এই স্কুলের উদ্যোগ বলে জানান অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী ফুয়াদ রাতুল। তিনি বলেন, এই পল্লীর মানুষগুলো সারাদিন আমাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে, তাদের সন্তানরাই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটা তো হতে পারে না। তাদের শিশুদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।

সারাদিন নিজের পড়ালেখার ব্যস্ততা শেষে প্রতিদিন বিকেলে এই পল্লীর শিশুদের সঙ্গেই মিশে যান সাদেক। সাদেক বলেন, আমরা মাত্র দুই মাস হয়েছে এই যাত্রায় নেমেছি। এই কয়েকদিনেই যে ভালোবাসা পেয়েছি তা অনন্য। তারা যখন ভাই বলে চিল্লাইয়া ওঠে, তখন মনে হয় তারা অনেক আপন। তাদের নিয়ে একসঙ্গে গান, কবিতা ও খেলা করার মতো আনন্দ কোথাও পাওয়ার কথা নয়।