দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এ জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকা শ্রমবাজার চালু করার ঘোষণা এসেছে। এবার শ্রমিক নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নিয়োগদাতা ও নিয়োগানুমতি আনা প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদিত ২৫ এজেন্সি থেকে পছন্দমতো এজেন্সি বাছাই করতে পারবে। মাত্র ৬ হাজার টাকা ফি দিয়ে যেকোনো এজেন্সি শ্রমিক পাঠাতে পারবে। সরকারের অনুমোদনক্রমে ৩১২টি এজেন্সি ব্যবসা করতে পারবে। চেষ্টা চলছে অন্য এজেন্সিগুলোকেও এর আওতাভুক্ত করার।
মালয়েশিয়া গমনে ইচ্ছুক শ্রমিকরা বলেন, মালয়েশিয়ায় মজুরি অধিক ও কাজের পরিবেশ ভালো। এখন সহজেই শ্রমিকরা যেতে পারবেন। এতে দেশে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও আশানুরূপ বৃদ্ধি পাবে। নতুন করে কলিং ভিসা চালুর খবরে সবার মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন ১ জুন থেকে নতুন করে বিদেশি কর্মী প্রবেশের সুযোগও বন্ধ করে দেয় দেশটি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)। এতে বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে কবে থেকে এবং কী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি মালয়েশিয়া সরকার।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, মালয়েশিয়ায় যখনই শ্রমবাজার খোলে তখন ব্যবসায়ীদের একটি গ্রুপ অন্যদেশকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিংবা ভ্রমণ ভিসায় অবৈধভাবে লোক পাঠানোর জন্য নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তারা সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, মন্ত্রণালয় ঘেরাও, বিভিন্ন ধরনের বিবৃতি ও অভিযোগ দিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বাধাগ্রস্ত করছে। শ্রমবাজারকে ঘিরে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। রাজধানীর নয়াপল্টনের ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিন বলেন, সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। বিশ্বের অন্য দেশে ভাষা জানা ও দক্ষতা ছাড়া শ্রমিক নেয় না, এদিক থেকে মালয়েশিয়া ব্যতিক্রম। তারা দক্ষ-অদক্ষ দুধরনের শ্রমিকই নেয়। ভাষা জানার প্রয়োজনও হয় না। আর সেখানে ন্যূনতম মজুরি ১৭শ রিঙ্গিত। আছে ওভারটাইম সুবিধা। তাছাড়া ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার মিল রয়েছে। ফলে সহজেই শ্রমিকরা মালয়েশিয়া যেতে পারে এবং উচ্চ বেতন পায়। তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুবই ভালো জায়গা মালয়েশিয়া। দুই বছরের বেশি সময় বাজারটি বন্ধ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মংস্থান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার ঐকান্তিক চেষ্টায় এই বাজারটি খোলা সম্ভব হয়েছে। এখন শ্রমিকরা স্বল্প খরচে নিরাপদ কর্মসংস্থান পাবে। কাকরাইলের ব্যবসায়ী শফি উদ্দিন বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক ফিরে আসছে। এ সময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া খুবই খুশির সংবাদ। আশা করছি, শ্রমিকরা স্বল্প খরচে নিরাপদে মালয়েশিয়া যেতে পারবে। আর নিজে কাজ আনা ও নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে বিএমইটি ছাড়পত্র নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘যখনই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয় তখনই একটি চক্র এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ওই চক্রটি মূলত, কাউন্টার সেটিংসহ বিভিন্ন অবৈধ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় লোক পাচার করে। বৈধভাবে শ্রমিক গেলে এই চক্রটির অবৈধ কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তারা বৈধভাবে শ্রমিক নেওয়ার বিরোধিতা করছে। সরকারের উচিত এই অসাধু চক্রকে শক্ত হাতে দমন করা।’
নোয়াখালীর চাটখিলের বাসিন্দা মহিউদ্দিন রিংকু বিদেশ যেতে ইচ্ছুক। তিনি বলেন, ‘আমার খালাতো ভাই ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া যান। তিনি ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি করছেন। আমিও অনেক দিন থেকে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছি। অপেক্ষায় ছিলাম মালয়েশিয়ার কলিং ভিসা কখন চালু হবে। এখন ঘোষণা এসেছে। আশা করছি, অল্প খরচে এবার যেতে পারব।’ একই কথা বললেন পাবনার চাটমোহর এলাকার পারভেজ আলম। তিনি বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালে চেষ্টা করে যেতে পারিনি। কলিং ভিসা চালুর অপেক্ষায় ছিলাম। এখন চালু হয়েছে। এ জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। কিন্তু বাজারটি চালু হয়নি। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যান তারেক রহমান। তার সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়।