হিন্দু-মুসলিম দুই রীতিতে শেষযাত্রা দেবাশীষ পরিবারের

পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৮ এএম

ভারতের কলকাতা নিউ মার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পরিবারের চারজনের মরদেহের শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। একই পরিবারে দুই ধর্মের অনুসারী থাকার কারণে হিন্দু ও মুসলিম দুই রীতিতেই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।

শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া সহকর্মী, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত পারিবারিক দৈন্যের মধ্যে থেকে সাংবাদিকতা পেশায় সততার নজির স্থাপন করে গেছেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির অবর্তমানে বিপন্ন পিতা-মাতা ও একমাত্র কন্যার পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গত শনিবার রাত ১টার পরে কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে দেবাশীষ দত্ত (৪০) ও তার ছেলে স্বর্ণ শীষ দত্তের (৩) মুখাগ্নী শেষে সমাধিস্থ করা হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী, সহকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ সময় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা ও অশ্রুসজল চোখে শেষ বিদায় জানান।

অন্যদিকে, রাত সাড়ে ১২টায় কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ায় মডেল মসজিদে নামাজের জানাজা শেষে পৌর গোরস্থানে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শিমমিন  (২৫) ও শ্বশুর আকরাম আলীর (৬৪) দাফন সম্পন্ন করা হয়। জানা যায়, দেবাশীষ ভালোবেসে আফসানা শিমমিনকে বিয়ে করেছিলেন।

এর আগে শনিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে দেবাশীষ দত্ত ও তার ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তের কফিন বন্দি লাশবাহী গাড়িটি শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসার সামনে পৌঁছায়। সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতরণ হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন দেবাশীষের মা-বাবা আত্মীয়স্বজন এলাকাবাসীসহ গণমাধ্যমকর্মীরা। শতশত মানুষের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।

অন্যদিকে, দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শিমমিন ও শ্বশুর আকরাম আলীর মরদেহ কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়ার বাসায় পৌঁছালে সেখানেও পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

নিহত দেবাশীষের পরিবারের মরদেহ সৎকারে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন উর রশীদ দেবাশীষের মায়ের হাতে এ টাকা হস্তান্তর করেন।

এদিকে, দেবাশীষের মৃত্যু এখনো মেনে নিতে পারছেন না সহকর্মীরা। সহকর্মীরা জানান, দেবাশীষ দত্ত কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করেছেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সদালাপী, বিনয়ী ও সহযোগিতা প্রবণ একজন মানুষ।

দেশটিভির জেলা প্রতিনিধি নাহিদ হাসান তিতাস বলেন, ‘দেবাশীষ স্বজনদের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসার জন্য ভারত গেলেন, ফিরলেন নিজেই লাশ হয়ে, লাশবাহী গাড়িতে। এটা বিশ^াস করতেও কষ্ট হচ্ছে। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘অভাব-অনটনের মধ্যে থেকেও কাউকে বুঝতে না দিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে কীভাবে নির্ভীক সাংবাদিক হয়ে ওঠা যায় দেবাশীষ তার জ¦লন্ত উদাহরণ’।

কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন বলেন, ‘দেবাশীষ দত্ত জীবনের প্রয়োজনে কোনো অপসাংবাদিকতায় পা না বাড়িয়ে বরং সব সংকট দুঃখ-বেদনা নিজের বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে নির্ভীক ও সৎ সাংবাদিকতার চর্চা করে গেছেন। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকের হারিয়ে যাওয়া জেলার গণমাধ্যমের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হলো। এই শূন্যতা কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়’।

একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা দেবাশীষের পরিবারের পাশে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান দেবাশীষের স্বজন, এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা জানান, দেবাশীষের উপার্জনের ওপরই তার পরিবারের সংসার চলত। তার বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা মূল্যের ওষুধ প্রয়োজন হতো। বাসাভাড়া দিতে হতো ৭ হাজার টাকা। বৃদ্ধ বাবা-মা’র সঙ্গে কন্যা শিশুটিকে নিয়ে এখন পরিবারটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

চ্যানেল ট্যুয়েন্টিফোর-এর স্টাফ রিপোর্টার শরীফ বিশশ্বাস বলেন, ‘দেবাশীষের মতো একজন তারুণ্যদীপ্ত, সৎ, উচ্চ শিক্ষিত মেধাবী সংবাদিককে আমরা হারিয়েছি। এটা আমাদের পেশার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ওর অবর্তমানে তার মা বাবা ও ছোট্ট শিশু কন্যা মহিমা আজ চরম বিপণেœর মুখে পড়েছে। তাদের সুরক্ষায় যার যতটুকু করার সুযোগ আছে ততটুকুই যেন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন এ অনুরোধ রাখছি।’

জানাজায় উপস্থিত কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘সাংবাদিক দেবাশীষকে অনেক আগেই থেকেই চিনি। সে একটা পজিটিভ মন-মানসিকতার মানুষ। আমরা কুষ্টিয়াবাসী ওর মতো একটা নির্মোহ সংবাদকর্মীকে হারালাম। এটা খুবই দুঃখজনক। এখন ওর পরিবারের মা-বাবা, শিশু-কন্যাটির যাতে একটা বেঁচে থাকার ব্যবস্থা হয় আমরা সেটা দলীয়ভাবে চেষ্টার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করব।’

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘জীবিত থাকতে সাংবাদিক দেবাশীষের এমন আর্থিক দৈন্যতার কথা আমাদের কারও জানা ছিল না। এমন দৈন্যদশার মধ্যে থেকেও যে একজন দায়বোধের সাংবাদিক হওয়া যায় সেটা দেবাশীষ প্রমাণ করে গেছেন। এসে জানলাম তার বাবা-মা-কন্যা চরম সংকটের মধ্যে আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

উল্লেখ্য, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট দেবাশীষ দত্ত ভারতের ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসা শেষে ১৯ আগস্ট তার দেশে ফেরার কথা ছিল। ফেরার পথে ওই রাতে কলকাতা নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেন। সেখানে রাতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয় জানের মধ্যে বাংলাদেশের ছিলেন সাতজন। সব প্রক্রিয়া শেষ করে প্রতীক্ষার তিন দিন পর ছয়জনের মরদেহ দেশে এসেছে, একজনের শেষকৃত্য সেখানে সম্পন্ন হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত